হাসান ইবনে সবা কে ছিলাে? তার বাবার আদি বসতি ছিলাে খােরাসানের তুস শহরে। বাবার নাম আলী ইবনে আহমদ। ভ্রাল ইসমাঈলী মাযহাবের অনুসারী ছিলাে। হাসানের জন্ম এই তুসেই। পরে তার বাবা রায় শহরে চলে যায়। রায় শহরের হাকিম বা প্রশাসক ছিলেন আবু মুসলিম রাজী। তার বাবা আলী ইবনে আহমদ আবু মুসলিম রাজী পর্যন্ত তার যােগসূত্র
স্থাপন করতে সক্ষম হয়। তার কাজ ছিলাে আর মুসলিম রাজীর তােষামােদি করা এবং মানুষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানাে। সে চাইলে সমাজের নির্দোষ-নিরপরাধ ও সজ্জন লােকদের গ্রেফতার করাতে পারতাে এবং অপরাধী, চোর-বাটপারদের নির্দোষ সাব্যস্ত করে ছাড়িয়ে নিতে পারতাে।
রায় বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যকেন্দ্র ছিলাে। আলী ইবনে আহমদ প্রায়ই।ভিনদেশী কোন ব্যবসায়ীকে ধোকা দিয়ে তার পণ্য কেড়ে নিতাে বা তার টাকা পয়সা ছিনিয়ে নিতাে। এ কাজ সে এমন দক্ষতা ও প্রভাব খাটিয়ে করতে, আক্রান্ত ব্যক্তি
তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে সাহস করতাে না। লােকদের মধ্যে তার ব্যাপারে সে।ছড়িয়ে রেখেছিলাে সে হাকিম আবু মুসলিম রাজীর বিশেষ লােক।
আলী ইবনে আহমদের শঠতা ও প্রতারণার খবর লােকেরা কম জানতাে না। সে দাস ব্যবসাও করতাে। এমন হতাে যে, একটি মেয়েকে অপহরণ করে লুকিয়ে টুকিয়ে বেচে ফেলতাে। সে কোন সুন্দরী যুবতী মেয়ে বা যৌবনবতী কোন বিধবাকে সম্মানজনক কায়দায় এমন করে ফুসলিয়ে তার ঘরে নিয়ে আসতাে যে, সেই মেয়ের ওপর জাদুর প্রভাব কাজ করতাে। সদ্য তরুণী বা যুবতী মেয়েরা পরিণামের কথা না ভেবে তার জালে জড়িয়ে পড়তাে। সে কয়দিন সে মেয়েটিকে ভােগ করতাে সে কয়দিন ক্রেতা খুঁজতাে। তারপর একদিন কোন পয়সাওয়ালা ক্রেতার হাতে তাকে সঁপে দিতাে।
কোন বাড়িতে বা বাজারে দোকানদারদের মধ্যে ঝগড়া লাগলে বা দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে ঝামেলা বাধলে সে বিচারক বনে গিয়ে তাদেরকে শায়েস্তা করতাে।
লােকেরা জানতাে এ লােক ধোকাবাজ-প্রতারক। তারপরও সামনে পড়লে তাকে সম্মান করতাে, তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে এবং সাহায্যও কামনা করতাে। লােকদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সে তাদের অনেক সমস্যার সমাধানও করে দিতাে। তার মধ্যে এত নির্লজ্জতা ছিলাে যে, কোথাও থেকে যদি তাকে তাড়িয়ে দেয়া হতাে তাহলে সে সেখান থেকে এক দরজা দিয়ে বের হয়ে আরেক দরজা দিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতাে এবং প্রতারণার অন্য কোন কলাকৌশল খাটিয়ে সে লােককে
একহাত দেখে নিতাে। লােকেরা যে জানতাে সে আবু মুসলিম রাজীর ঘনিষ্ঠ লােক-এটা ভুল ছিলাে না।
আবু মুসলিম অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ও কঠোর প্রকৃতির হাকিম ছিলেন। কিন্তু আলী ইবনে আহমদ তার ধোকার কারিশমা খাটিয়ে তার বন্ধুত্ব অর্জন করে নেয়। আবু মুসলিম রাজী ছিলেন সরল বিশ্বাসী আহলুস সুন্নত ওয়াল জামাআত। আলী আহমদ ছিলাে ইসমাঈলী। কিন্তু রাজীকে সে নিশ্চয়তা দিয়ে রেখেছিলাে যে, সে আহলে সুন্নত। একবার আবু মুসলিম বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলেন, আলী ইবনে আহমদ সুন্নী নয় ইসমাঈলী। আবু মুসলিম তাকে ডেকে কৈফিয়ত চাইলে সে হাতে পবিত্র কুরআন নিয়ে
শপথ করে যে, সে সুন্নী মুসলমান। তার ছেলে হাসান ইবনে সবা কয়েক বছর ধরে এক ইসমাঈলী পণ্ডিত আবদুল মালিক ইবনে আতাশের কাছে পড়তে যেতাে। আবু মুসলিম একদিন তা জানতে পেরে
আলীকে ডেকে পাঠালেন। কার ছেলে কোথায় পড়ে এবং কি পড়ে তাতে আমার কিছু যায় আসে না ’ – আবু মুসলিম বললেন- “ সন্তানদের জন্য পিতা মাতারা কি ফয়সালা করবে তার সাথে আমার
কোন সম্পর্ক থাকার কথা নয়। কিন্তু তােমার ছেলের ব্যাপারে এজন্যই বলছি যে, তুমি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত, অথচ তােমার ছেলে এক ইসমাঈলী শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করছে ... কেন? ... এটা কি তােমার ইসমাঈলী হওয়ার প্রমাণ নয়?” না হাকিম আবু মুসলিম! '-আলী ইবনে আহমদ বললাে- এটা আমার অক্ষমতার প্রকাশ। আমি আমার ছেলেকে নিশাপুরের ইমাম মুওয়াফিকের কাছে পাঠাতে চাই; কিন্তু এই ইচ্ছা পূরণ করার মতাে পয়সা আমার হাতে নেই। ঠিক আছে, পয়সার ব্যবস্থা আমি করছি। সরকারের তহবিল থেকে পয়সার বন্দোবস্ত করে দেবাে।।আলী ইবনে আহমদ খুশীতে ফেটে পড়ার ভান করলাে। যেন তার বিরাট বড় এক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। সরকারি তহবিল থেকে সে পয়সা আদায় করে তার ছেলে হাসানকে নিশাপুরে ইমাম মুওয়াফিকের কাছে পাঠিয়ে দিলাে। ইমাম মুওয়াফিক শক্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের লােক ছিলেন এবং বাতিল ও মিথ্যা মতবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন আপােষহীন।
হাসান ইবনে সবা তার বাবার ধূর্তামি ও প্রতারণা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভালাে করেই জানতাে। বাবার এসব কর্মকাণ্ডে সে মুগ্ধ হয়ে শঠতা, ধূর্তামি ও প্রতারণার পথকেই তার অবলম্বনীয় নীতি বানিয়ে নেয়। সে তার বাপের খাছ কামরায় নজর কাড়া সুন্দরী মেয়েদেরও কম দেখেনি। এটাও সে জানতাে যে তার বাবা প্রায়ই এ ধরনের মেয়েদের এনে এক ধরনের নেশা পান করিয়ে বশে নিয়ে এসে তাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করে। হাসান ইবনে সবা একদিন সেই নেশার বস্তুটি দেখতে পেয়ে সামান্য কিছু শরবতে
মিশিয়ে পান করে। একটু পর সে অনুভব করে দুনিয়ার সব কিছু রঙ্গিন পেজা তুলার মতাে ভেসে বেড়াচ্ছে। আহ কি সুন্দর-মােলায়েম দৃশ্য। যেন বাড়ির ঝি চাকরানী সবাই অসম্ভব সুন্দরী-রূপসী হয়ে তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বাড়ির এক বুড়ি ঝিছিলাে। বুড়িও অপরূপা ষােড়ষী হয়ে তাকে যেন কাছে ডাকছে। অনেকক্ষণ সে এই।ঘারের মধ্যে বুদ হয়ে থাকে। সে তার বাবার তােষামােদি ভাষা শিখে নিয়েছিলাে। কৈশােরেই সে ভাষায় মুখের মধু ঢালতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাে। নিজের পিতাকে তার উপযুক্ত শিক্ষক মনে হতাে।তার বাবাও বুঝতে পেরেছিলাে তার ছেলের মধ্যে পিতার চিন্তাধারাই শিকড় গেড়ে বসছে।।ছেলেকে এজন্য বাধা দিবে তাে দূরের কথা সবসময় উৎসাহিত করতাে। নিশাপুরে ইমাম মুওয়াফিকের কাছে পাঠানাের সময় ছেলেকে এজন্য কিছু উপদেশও দেয়।‘ এটা ভুলে যাসনে বেটা! '-আলী ইবনে আহমদ ফিসফিসিয়ে তার ছেলেকে।বলেছিলাে- ‘ আমরা ইসমাঈলী আহলে সুন্নত নয়। ইসলামকে ধ্বংসের জন্যে ইসমাঈলীই যথেষ্ট। তুই আহলে সুন্নতের সবক নিবি কিন্তু থাকবি ইসমাঈলী হয়ে। এই।মাদরাসা থেকে যারা কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে বের হয় তারা দেশ ও সমাজের উঁচু পদে উঠে যায়। এ ধরনের যােগ্য দু'একটি ছেলের সঙ্গে তুই বন্ধু পাতিয়ে নিস। ভবিষ্যতে এটা তাের কাজে আসবে। বাপ সম্ভবতঃ আঁচ করতে পারেনি তার ছেলে এই বয়সে তার চেয়ে অনেক বেশি ধুরন্ধর হয়ে গেছে। তার ছেলে মাদরাসায় গিয়ে খাজা হাসান তুসী ও উমর খয়ামের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নেয়। তার দুর্বীন মােড়া চোখ দেখে নিয়েছিলাে, পড়ালেখায় এরা যেমন তুঘােড় ভবিষ্যতেও নিশ্চিত করে দেশের বড় কোন পদ বাগিয়ে নেবে। তিন বন্ধু যে এক অঙ্গিকারনামার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলাে এটা আসলে হাসান ইবনে সবার ধূর্ত মাথা থেকেই বেরিয়েছিলাে। যদিও সেই অঙ্গিকারনামা থেকে উমর খয়ামও ফায়দা উঠিয়েছিলাে, কিন্তু তা ছিলাে এক সরলমনা বন্ধুর নির্দোষ দাবী নিয়ে উপস্থিতি। এটা তার প্রাপ্য অধিকারই ছিলাে। উমর খয়ামের উদাহরণ উমর খয়ামই। এর দ্বিতীয় কোন উদাহরণ নেই। পৃথিবীতে আরেকজন উমর খয়াম আর আসেনি। কিন্তু হাসান ইবনে সবা এর থেকে যে ফায়দা উঠালাে তা ছিলাে এক ইবলিসী কীর্তি। এটা ছিলাে তার প্রথম পদক্ষেপ। প্রথম সাক্ষাতে সে যে নিযামুল মুলককে বলেছিলাে এতদিন সে রােজগার ছাড়া কাটিয়েছে সেটা ছিলাে ডাহা মিথ্যা। সে এতদিন কিছু গােপন কর্মকাণ্ড নিয়ে মেতে ছিলাে। ইসলামের নাম ব্যবহার করে সে এক ফেরকা (দল) বানানাের জন্য রাস্তা পরিষ্কার করে। এজন্য সে মিসর গিয়েছিলাে। মিসরে ছিলাে উবায়দীদের শাসন। যাদেরকে প্রকাশ্যে ইসমাঈলী বলা হতাে, কিন্তু তলে তলে তারা ছিলাে বাতিনী। অর্থাৎ ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য ইসলামেরই নাম ব্যবহার করে দলবাজি করা। হাসান ইবনে সবা মিসর থেকে রায় চলে আসে। কয়েকদিন পর মিসর থেকে উবায়দীদের...........
লেখক : এনায়েতুল্লা আলতামাশ
0 মন্তব্যসমূহ