‘ কিন্তু খাজা! একটু মন দিয়ে আমার কথা শােন। আমি শুধু আমার ও আমার লােকদের জীবিকা চাই না, পুরাে মানবজাতির জন্য আমি কিছু একটা করতে চাই। আমি দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য কিছু ঔষধি গাছের শিকড় ও ভেষজ চিকিৎসার নুপান তালাশ করছি, এর সঙ্গে অতি মূল্যবান কিছু জিনিসপত্রও দরকার আমার। এ এতটুকু অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আমার প্রয়ােজন যার দ্বারা আমার ঘরের লােকেরা দু'বেলা রুটির স্বাদ পায়। নেযামুল মুলক উমর খয়ামের পিকৃত পাণ্ডুলিপির একাংশ মনােযােগ দিয়ে দেখলেন। দেখা শেষ হলে তিনি উপলব্ধি করলেন, তার এই বন্ধুটি দর্শন, সাহিত্য, কলা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাে বটেই অন্যান্য বিষয়েও অসামান্য ব্যুৎপত্তি ও দক্ষতা অর্জন করেছে। সে যদি সামান্য অর্থ সাহায্যও পায় তাহলে আগত অনাগত সব মানুষের কল্যাণের জন্য তার এই অধ্যাবসায় অনেক বড় অবদান রাখবে। উমর কে তিনি তার মেহমানখানায় নিয়ে উঠালেন এবং তার দর্শন ও সাহিত্য চর্চা এবং গবেষণা কর্ম সুলতান আলিপ আরসালানকে দেখালেন। তারপর এর সীমাহীন গুরুত্বের কথাও তুলে ধরলেন। সেলজুকি সুলতানদের কাছে বড় বড় বিদ্বান পণ্ডিত বিশেষ করে উমর খয়ামের মতাে অসামান্য প্রতিভাধারী ও মনীষাদীপ্ত পণ্ডিতদের যথেষ্ট কদর ছিলাে। সুলতান উমর খয়ামের জন্য বাৎসরিক বারশ মিছকাল (কয়েক লক্ষ) স্বর্ণমুদ্রা বৃত্তি নির্ধারণ করলেন। উমর খয়াম তার প্রথম বৃত্তির পয়সা নিয়ে নিশাপুর চলে গেলেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উমর খয়াম যখন সর্বাত্মক সহযােগিতা পেলেন তিনি তার গবেষণা কর্মে নিবিষ্ট হয়ে পড়লেন। তিনি প্রথম যে বইটি লিখলেন তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বইটি উৎসর্গ করলেন নেযামুল মুলকের নামে। তারপর তিনি তার অভিজ্ঞতা ও গবেষণার সময়ে লিখলেন ইলমুলমুসাহাত ওয়াল মাকআত তার কলম বয়ে কালাে তরবাহিত অথৈ জলরাশির মতাে। উমর খয়াম এভাবে ইরানসহ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে এত জননন্দিত হয়ে উঠলেন যে, ইবনে সীনার সমমানের মনীষী বলে তাকে সবাই স্বীকার করলো। নিশাপুর ছিলাে খুরাসানের রাজধানী। সেখানে ছিলেন সুলতান মালিক শাহ।সুলতান মালিক শাহ জ্ঞানী ও পণ্ডিতজনদের অসামান্য মর্যাদার চোখে দেখতেন। উমর খ্যাতি যখন তার কানে এলাে তিনি তাকে নিশাপুর নিয়ে এলেন এবং বর্ষপঞ্জি সংশােধনের দায়িত্ব দিলেন। উমর খয়াম অংক ও জ্যামিতি শাস্ত্রেও অনেক সূত্র আবিষ্কার করেন এবং প্রচলিত সূত্রের অনেক সংশােধনী আনেন।নেযামুল মুলকের সঙ্গে যখন উমর প্রথম সাক্ষাত হয় তখন আলাপ সঙ্গে তাদের মধ্যে হাসান ইবনে সবাহের কথাও উঠলাে। জানাে উমর সে কোথায় আছে? '-নেযামুল মুলক জিজ্ঞেস করলেন।
‘ আমি এতটুকুই জানি সে রায় চলে গিয়েছিলাে উমর খয়াম বললেন- সে সেখানকারই লােক। তােমার হয়তাে মনে আছে সে যেমন চালাক তেমন সাবধানী লােক ছিলাে। তােমার মনে আছে কিনা জানি না। সে একবার এক ছাত্রের কিছু পয়সা চুরি করেছিলাে এবং ধরাও পড়েছিলাে। আমরা তার পক্ষে ওকালতি করে বলেছিলাম হাসান চোর হতে পারে না। অথচ সে আসলেই চুরি করেছিলাে। তারপরও আমরা তাকে বন্ধু বলেই দেখতাম। হ্যা উমর! আমার মনে পড়েছে। তার মধ্যে অবশ্যই এমন কিছু ছিলাে যা আমাদের এত ভালাে লাগতাে যে, তাকে ছাড়া নিজেদের বৃথা মনে হতাে।‘ এটা ছিলাে আসলে তার মুখের ভাষার নৈপুণ্য-উমর খয়াম বললেন ‘ আমরাও তাে কথা বলতাম। কিন্তু ও যখন বলতে তখন কেমন যেন মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করতাে। সে এমনিতেও দারুণ প্রতিভ ছিলাে। তার চোখেও এমন আকর্ষণের দৃষ্টি ছিলাে যে, সে যদি কারাে চোখে চোখ রেখে কথা বলতাে তাহলেশ্রাতা নিঃসংকোচে তা মেনে নিতাে।দুই বন্ধু হাসান ইবনে সবাহকে নিয়ে কথা বলতে বলতে অর্ধেক রাত পার করেদেন। তারপর তারা শয়নকক্ষে চলে যান। দুতিন দিন পর উমর খয়ামও চলে যান।চার পাঁচ দিন পর নেযামুল মুলককে খবর দেয়া হলাে রায় থেকে একলোক এসেছে। তার নাম বলেছে হাসান ইবনে সবাই।‘ হাসান ইবনে সবাহ! ’-নেযামুল মুলকের আওয়াজ আবেগে কেঁপে গেলাে।।তিনি উঠতে উঠতে চললেন- তাকে চটজলদি ভেতরে নিয়ে এসাে। হাসান ইবনে সবাই ভেতরে এসে দেখলাে নেযামুল মুলক তাকে শুভেচ্ছা জানানাের জন্য নিজে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। দুজনে দুজনকেই আলিঙ্গনাবদ্ধ হতে দেখা গেলাে। যখন শুনলাম আমার দোস্ত ওযিরে আজম বনে গেছে খুশীতে আমি ফেটে পড়লাম -- হাসান ইবনে সবাই বললাে শুনতেই পড়িমরি করে দৌড় লাগিয়েছি আমার বাল্যকালের জিগরি দোস্তকে মন্ত্রিত্বের আসনে সমাসীন দেখব বলে। তা তাে দেখছেই। কিন্তু এই এতগুলাে বছর ছিলে কোথায় তাই বলাে। আর করছেই বা কি? তােমার জীবিকাই বা কি? জীবিকার পথ আমার মাটি দিয়ে ঢাকা। অনেক ভাগ্য-পরীক্ষা দিয়েছি। মিসর পর্যন্ত গিয়েছি, কিন্তু ভাগ্য কখনাে আমার সঙ্গ দেয়নি। কখনাে রুজির সন্ধান পেয়েছি তারপর আবার সেই বেরােজগারি। তবে এক জায়গা থেকে আমাকে দারুণ জবাব দিয়েছে বলেছে, তােমার শিক্ষার দণ্ড এত বেশি যে, ছােট কোন চাকরি তােমার জন্য।পােষাবে না। এজন্য তােমার মন ব্যবসা বাণিজ্যও গ্রহণ করছে না। “ হ্যা হাসান। সে লােক বুদ্ধিমানের কথাই বলেছে। ইমাম মুওয়াফিকের কোন ছাত্র সাধারণ কোন নওকরীতে ঢুকতে পারে না এবং দোকানদারীও তাকে মানায় না।।আমাদের বন্ধু উমর এসেছিলাে। সে এখন উমর খয়াম। দর্শন, কাব্যসাহিত্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে সে এখন দারুণ কীর্তিমান। কিন্তু দু’পয়সা রােজগারের কোন উপায় ছিলাে না তার।
ও হা হা উমর! আমাদের দারুণ বন্ধু ছিলাে। তার তাে দার্শনিক আর কবি হওয়ারই কথা ছিলাে। ‘ সে আমাকে আমাদের বাল্যকালের একটি অঙ্গিকারনামার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেছে। আমি সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম। আমরা তিন বন্ধু মাদরাসার এক রাতে সেই অঙ্গিকারটি করেছিলাম। তারপর তুমি কি ওর জন্যে কিছু করেছে?‘ হা হাসান! তা করেছি বৈকি। ওর জন্য আমি বাৎসরিক ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমি তােমাকে সেই অঙ্গিকারনামার কথা মনে করিয়ে দিতে এসেছি। কিন্তু আমি কোন ভাতা-বৃত্তি চাই না। আমার শিক্ষা ও বংশগত মর্যাদার ভিত্তিতে কোন চাকরি চাই। আমি বন্ধুর প্রাপ্য অবশ্যই পূরণ করবাে হাসান! বাল্যকালের সেই অঙ্গিকারনামাও বাস্তবায়ন করবাে। তুমি সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তৈরী হয়ে নাও। আগে আমি
তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলে নিই। 'আসলে এই ওয়াদা বা অঙ্গিকার তাে ছিলাে কলকাকলিতে মুখর তিন কিশােরের একটি গম্ভীর মুহূর্তের অনুবাদ। ছেলেবেলার অতি দুরন্তপনা ছাড়া এর আর কিসের
গুরুত্বই বা ছিলাে। কিন্তু নেযামুল মুলক ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন ও খােদাভীরু লােক। সুলতান চেগরা বেগ তার এই সৌজন্যবােধ দেখেই রাষ্ট্রের এত বড় পদে আসীন
করেছিলেন এবং এর জোরেই তিনি সালতানাতের ওযিরে আজম হতে পেরেছিলেন। ছেলেবেলার সেই প্রতিশ্রুতিকে তিনি এতই গুরুত্ব দিলেন যে, হাসান ইবনে সবাহর শিক্ষা, যােগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তার কথা তিনি সুলতানের কাছে এমনভাবে বর্ণনা করলেন যে, সুলতান দারুণ প্রভাবান্বিত হলেন। নোমুল মুলক হাসান ইবনে সবাহকে বললেন, তাকে তিনি সুলতানের কাছে নিয়ে যাবেন। সে যেন তার শিক্ষা ও তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয় দিয়ে সুলতানকে মুগ্ধ করে দেয়।
হাসান ইবনে সবাই তাে ছিলাে কথার উস্তাদ। নেযামুল মুলক তাকে সুলতানের কাছে নিয়ে গেলে মুখের জাদুতে সে সুলতানকে বশ করে ফেললাে। আর বাকী পথ তাে নেযামুল মুলকই পরিষ্কার করে রেখেছিলেন।
‘ হাসান ইবনে সবাহকে আমি মহামান্য সুলতানের বিশেষ উপদেষ্টার মর্যাদা প্রদানের চেয়ে আরাে নীচু পদের লােক ভাবতে পারছি না ’-নেযামুল মুলক বললেন আর মহামান্য সুলতানের বর্তমানে একজন উপদেষ্টারও প্রয়ােজন। ‘ আপনার আবেদন মঞ্জুর করা হলাে সুলতান বললেন-“ আপনি তাকে পছন্দ
মতাে গড়ে নিন এবং সালতানাতের সমস্ত কার্যাদি ভালাে করে বুঝিয়ে দিন। আপনার তত্ত্বাবধানে কিছু দিন ওকে আপনি রাখুন। হাসান ইবনে সবাহ যে পদ পেলাে তা মন্ত্রীর পদমর্যাদার চেয়ে কম নয়। সে
সেদিনই মালপত্র ও বৌবাচ্চা আনতে চলে গেলাে রায়।
নেযামুল মুলক টের পেলেন না তিনি এক ইবলিসের জন্য বেহেশতের দরজা খুলে দিয়েছেন।
লেখক : এনায়েতুল্লা আলতামাশ

0 মন্তব্যসমূহ