সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস।সেলজুক রাজত্বের ইতিহাস।সেলজুক সালতানাত।সেলজুকদের ইতিহাস-ধারাবাহিক পর্ব -৬



বিশ বাইশ বছর পর সুলতান চেগরা বেগের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন ঘটে। হাসান তুসী ওযীরে আজম পদে সমাসীন হন। তখন সুলতান চেগরাবেগের পৌত্র।মালিক শাহ সুলতান ছিলেন। মারু অর্থাৎ দ্বিতীয় রাজধানীতে ছিলেন সুলতান আলিপ আরসালান। সেলজুকি সুলতানরা হাসান তুসীর উপাধি দিয়েছিলেন ‘ নেযামুল মুলক ’-রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পরিচালক। পুরাে দেশ তাকে এই নামেই চিনতাে। তার হাসান তুসী নামটা একসময় সেলজুকিদের আরােপিত উপাধির আড়ালে চলে যায়। নেযামুল মুলক বাগদাদে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাদরাসায়ে নেজামিয়া নামক এক।ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও বিখ্যাত মনীষী বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ এখান থেকেই এক সঙ্গে বৃত্তি নিয়ে বেরিয়েছিলেন। একদিন নোমুল মুলক তুসী কোন এক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাকে জানানােহলাে, নিশাপুর থেকে উমর খয়াম নামে এক লােক তার সাক্ষাতে এসেছে। নেযামুল মুলক তার স্মৃতির পাতা হাতড়ে বেড়ালেন। এই নাম তার কিছুটা পরিচিত মনে হলাে তবে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। কিছুটা সংশয় নিয়ে তাকে ভেতরে পাঠিয়ে।দিতে বললেন। উমর খয়াম ভেতরে এলেন। নেযামুল মুলক তাকে দেখেই উছলে উঠলেন।।দু'জনে দু'জনকে কম্পিত হাতে উষ্ণ আলিঙ্গনে বেঁধে ফেললেন।।তাদের বন্ধুত্ব ছিলাে অতি গভীর। তারা তখন ইমাম মুওয়াফিকের কাছে একই সাথে পড়তেন। ইমাম মুওয়াফিক তার অধীনে ছাত্র নিতেন অত্যন্ত কম। তার কাছ থেকে যার কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে বেরােতে তারাই দেশের উচ্চপদস্থ পদে নিয়োেগ পেতে বা নিজেকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত একজন হিসেবে চিহ্নিত করতে পারতাে। এর উদাহরণ হিলেন হাসান তুসী।

দ্বিতীয় উদাহরণ ছিলেন উমর খয়াম। যার লিখিত রুবাঈ, শাহনামা পরে তাকে পৃথিবী বিখ্যাত করেছিলাে। তার সাহিত্যে শুধু রসবােধই ছিলাে না বড় বড় দার্শনিকরা তার কবিতা থেকে দর্শন ও প্রজ্ঞা লাভ করেন। তার রুবাইয়াতে যদিও রমণীয় সৌন্দর্যের অফুরন্ত সৌরভ পাওয়া যায়, কিন্তু জীবনদর্শন এবং মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজ্ঞানও এতে কম কিছু নয়। বাস্তবের কালিতে অংকিত কল্পনার গভীর পংক্তিমালায় সাজানাে তার রুবাইয়া " আজো পাঠকের অন্তরে লাবণ্য ছড়ায়, মানুষের স্বপ্নের অরণ্যে রুবাইয়াত তাই আজো প্রাণবন্ত।উমর শুধু একজন শ্রেষ্ঠ কবিই ছিলেন না, তিনি একজন দার্শনিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীও ছিলেন। চিকিত্সা নেই এমন অনেক রােগের ঔষধও তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। কথিত আছে, সকল রােগের মহৌষধ ও দীর্ঘ আয়ুর নিশ্চয়তা দানকারী‘ আবেহায়াতও তিনি তৈরী করেছিলেন। তবে ইতিহাসে এর সত্যতার প্রমাণ মিলেনি।


সেই উমর খয়ামই তার বাল্য ও পাঠ্যবন্ধু হাসান তুসী নেজামুল মুলকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। উমর খয়ামের বাবা আমীর ঘরনার লােক ছিলেন না। তার বাবার নাম ছিলাে উসমান। তাবু ও ত্রিপলের ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। তাবুর আরব প্রতিশব্দ হলাে খিমা। এজন্য তাকে উসমান খয়াম বলে লােকে ডাকতাে। মানে তবুওয়ালা উসমান। উমর যখন সাহিত্য ও কাব্য জগতে নিজের নাম উচ্চকিত হতে

দেখলেন তখন তার বাবার পেশাগত পদবী ‘ খয়াম ’ তার নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে উমর খয়াম করে নেন। গােটা দুনিয়ার কাছে তিনি তাই উমর খয়াম।

‘ উমর! ’-নেযামুল মুলক আনন্দিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন-“এতদিন কোথায় ছিলে? আজ তুমি বাল্যস্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে। ‘ খাজা। প্রথম কথা হলাে, আমি এখন শুধুই উমর নয়-উমর খয়াম আমি। ওপর ওয়ালার কৃপায় কাব্যজগতে একটি জায়গা হয়ে গেছে আমার। দর্শন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভাগ্য পরীক্ষা দিচ্ছি। সাহিত্যও হচ্ছে দর্শন শাস্ত্রও চর্চা হচ্ছে, কিন্তু-রুটি রুজির দরজা এখনাে খুলেনি। বাবা তাঁবু তৈরী করেন। এই পেশা ধরতে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু মন থেকে এর কোন সাড়া পাইনি কখননা। আমার অন্তর-সত্তা আমাকে অন্য পথ দেখাচ্ছে। আমার বাবাও আমার প্রতি বিরক্ত-আমি রুটি-রুজিতে তার সঙ্গ দেইনি বলে।কিছু ‘ একটা তাে তােমার করা  দরকার,-নেযামুলমুলক বললেন-“ কাজ ছাড়া জীবন তাে কোন জীবন নয়।

‘ আমি একটি অঙ্গিকারনামার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে এসেছি ' খাজা। অবশ্য মৌখিক অঙ্গিকারনামা। যা আমরা আমাদের ছাত্রজীবনে করেছিলাম।

‘ অঙ্গিকারনামা?-নেযামুল মুলক তার স্মৃতির পাতার উপর থেকে পরগাছা সরাতে শুরু করলেন- বাইশ তেইশ বছর হয়ে গেছে উমর! ... একটু ইঙ্গিত তাে দিবে। নেজামুল  মুলক ও উমর খয়ামের আরেকজন পাঠ্যসঙ্গী ছিলাে। তার নাম ছিলাে হাসান ইবনে সবাহ। ক্লাশে যে শুধু এই তিনজনই ছিলাে এমন নয়। আরাে অনেকেই ছিলাে কিন্তু তাদের তিনজনের ঘনিষ্ঠতা এত গভীর ছিলাে যে, তিনজন এক কামরায় ঘুমুতাে। এক সঙ্গে খাবার দাবার সারততা এবং একজন যেদিকে যেতো অন্য দুজনও তার পিছু নিতাে।

‘ আমাদের ছাত্রজীবনের এক রাতের কথা স্মরণ করাে খাজা। -উমর খয়াম হাসান তুসীকে তাদের অঙ্গিকারনামার কথা মনে করিয়ে দিলেন। আমরা তিন বন্ধু সেদিন যখন ক্লাশের পড়া তৈরী শেষ করলাম, হাসান ইবনে সবাই কি মনে করে তখন

বললাে- এই মাদরাসার ব্যাপারে সবাই জানে, এখান থেকে যারা লেখাপড়া শেষ করে বেরােয় এবং ইমাম মুওয়াফিক যাকে মেধাবী ও যােগ্যতাবান বলে স্বীকৃতি দেন কর্মজীবনে সে অনেক উঁচুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে ... তারপর হাসান সবাই বলেছিলাে- আমরা তিনজনই যে বড় কিছু হবে এমন নাও ঘটতে পারে। হতে পারে আমাদের একজন অনেক বড় কিছু হবে আর বাকী দু'জন কষ্টে সৃষ্টে দুবেলার রুটি

জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খাবে ....হাসান ইবনে সবাহ আরাে বলেছিলাে- তাহলে এসাে আমরা পরস্পর এই অঙ্গিকার করি যে, আমাদের মধ্যে যে কেউ উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে সে তার অন্য দুই বন্ধুকে অর্থনৈতিক সহযােগিতা করবে এবং তার স্বাচ্ছন্দ জীবনে তাদেরকেও সে সমান অংশীদার করবে বা তার জীবিকার বন্দোবস্ত করে দেবে। শুধু নিজের স্বার্থ নিয়ে অমানবিক আচরণ করবে না। আমরা তিনজনই সুস্থ ও সত্য মনে বলেছিলাম এবং অঙ্গিকার করেছিলাম হ্যা এমনই হবে। হ্যা উমর! নেযামুল মুলক মুচকি হেসে বললেন- ' আমার মনে পড়েছে। আমার যতটুকু মনে পড়ছে আমিই সবচেয়ে জোর গলায় বলেছিলাম, আমাকে মহান আল্লাহ বড় কোন পদে আসীন করলে এবং আমার দুই বন্ধু যদি আমাকে প্রয়ােজন মনে করে আমি অর্থনৈতিক সহযােগিতাসহ সবরকম সহযােগিতাই করবাে।” ‘ তাহলে খাজা এখন বলাে ” ... উমর খয়াম বললেন-' আমি তাে তােমাকে বলেছি এ পর্যন্ত জীবিকার উল্লেখযােগ্য কোন মাধ্যম আমি পাইনি। ' আমি এর একটা ব্যবস্থা অবশ্যই করবাে ’-নেযামুল মুলক বললেন-“ তুমি অনেক বড় বিদ্বান ও পণ্ডিত তাে বটেই। তারপর আবার কাব্যসাহিত্য, দর্শন ও চিকিৎসা শাস্ত্রেও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে যাচ্ছে। আমি সুলতানকে বলবাে, সালতানাতের জন্য তুমি অত্যন্ত নির্ভরযােগ্য ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে। সুলতানকে আরাে বলবাে, তােমাকে উঁচু কোন পদ দিয়ে যেন আমার সহযােগী করে দেন। সুলতান

আমাকে ভালাে জানেন এবং আমার প্রতি বেশ আস্থাবান। ” তুমি আমার জন্য যা করতে স্বাচ্ছ এর জন্য আমি সত্যিই তােমার প্রতি কৃতজ্ঞ ’- উমর খয়াম বললেন-' খাজা! তুমি তাে তােমার সঙ্গে আমাকে উচ্চাসনে বসাতে চাচ্ছাে, আমি কিন্তু এর উপযুক্ত নই। সারা জীবন আমি তােমার প্রতি কৃতজ্ঞচিত্ত থাকবাে। না উমর! আমার মনে হয় তুমি যে এতকাল জীবিকার সন্ধান ছাড়া কাটিয়েছাে তাই নিজের ওপর তােমার পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস নেই। আমি তােমার আস্থা ফিরিয়ে আনতে চাই। আমি পুরোপুরি আশাবাদী মহামান্য সুলতান তােমাকে উঁচু কোন পদে গ্রহণ করে নেবেন। খাজা! কথা এটা না। কোন কাজে আমি ঘাবড়াই না এবং রােজগারবিহীন জীবনও কোন ক্ষতিকর প্রভাব আমার ওপর ফেলেনি। আমার মন যে পথে প্রতিভাকে শানিত করতে চাচ্ছে আমি সে পথের বাতিঘর পর্যন্ত পৌঁছতে চাই। আমি আমার লেখালেখি, কাব্যচর্চা এবং দর্শন ও চিকিৎসা শাস্ত্রে যে গবেষণা করেছি।এর সব পাণ্ডুলিপি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। সাহিত্য ও দর্শন শাস্ত্রে আরাে অনেক গবেষণা ও উদঘাটনের বিষয় বাকী আছে আমার। পাণ্ডুলিপির বােঝাটি এক নজর দেখে নাও। আমার কাছে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার মতাে যথেষ্ট পরিমাণ পয়সা নেই। এ কাজে তাই আমি সামনে অগ্রসর হতে পারছি না। আমি যদি এই চাকরি গ্রহণ করি তাহলে শুধু আমার ও আমার পরিবারের একটি সম্মানের রুটি রুজির সংস্থান নিশ্চিত হবে ' ...



লেখক :এনায়েতুল্লা আলতাশ


0 মন্তব্যসমূহ