এক প্রতিনিধি দল তার কাছে আসে। কাজ শেষ করে প্রতিনিধিদল চলে যায়। তবে আবু মুসলিম রাজী তা জানতে পারেন এবং হাসানের কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও কিছুটা আঁচ করতে পারেন। আবু মুসলিম হাসানকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। হাসান ইবনে সবা টের পেয়ে রায় থেকে পালিয়ে যায়। নেযামুল মুলকের মানবিকতা, অনুগ্রহ ও চেষ্টা চরিত্রের কারণে সে যখন সুলতান মালিক শাহের উপদেষ্টার পদ পেলাে তখন তার কুচক্রী মনােভাব শতগুণ ফুলে ফেঁপে উঠলাে। রায়তে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও স্ত্রী-সন্তানদের নিতে এলে আবু মুসলিম রাজী তার রাষ্ট্রীয় পদপ্রাপ্তি সম্পর্কে জানতে পারেন। তাই তিনি তাকে আর না

ঘাটানােরই সিদ্ধান্ত নেন। হাসান ইবনে সবা রায় এসে তার বাবাকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পদপ্রাপ্তির খুশির

সংবাদ শােনায়। তার বাবা তখন অন্তিম শয্যায়।

এখন আমি শান্তিতে মরতে পারবাে ’-আলী ইবনে আহমদ বললাে- ‘ আমি তােমাকে ঐ আসনেই দেখতে চেয়েছিলাম ... এখন তােমার কাজ কি জানাে?

জানি ’-হাসান বললাে- সর্বপ্রথম নেযামুল মুলককে তার চেয়ার থেকে উঠিয়ে মালে থেকে সরিয়ে দেয়া এবং ওযিরে আজমের পদ দখল করা। ‘ সাবাশ বেটা! তুমি দরজায় ঢুকে পড়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কামরাটি দখল করাই বড় কাজ ।'... মনে রেখাে বেটা! পাপের শক্তি অনেক বড় শক্তি। এর চেয়েও বেশি শক্তি নারী ও মদের নেশায় রয়েছে। এই দুই জিনিসের বদৌলতে দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাবান ও পরাক্রমশালী ম্রাটকেও তােমার পদতলে বসাতে পারবে। কথা বলতে বলতে আলী ইবনে আহমদ হঠাৎ নড়ে উঠলাে এবং তার অপবিত্র দেহ থেকে আত্মা বেরিয়ে গেলাে। কিন্তু সে তার ইবলিসি ও শয়তানীর অশরীরী আত্মাটি তার ছেলের দেহে স্থানান্তর করে গেলাে। হাসান ইবনে সবার আজ প্রায় বিশ একুশ বছর আগের কথা মনে পড়ছে। যখন তার বাবা তাকে ইমাম মুওয়াফিকের কাছে পাঠানাের আগে এক ইসমাঈলী পাণ্ডা আহমদ ইবনে আতাশের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাে। কোন মানুষ প্রথমে আপনা থেকেই পাপের পথে পা বাড়ায় না, অন্যের পাপ স্পর্শেই তাকে পাপাসক্ত করে এবং কোন মানুষ নিজে নিজেই খােদাভীরু ও আত্মিক পরিশুদ্ধি পায় না; পরিবেশ ও কিছু মানুষের সমন্বিত প্রভাবই তাকে পূর্ণ মানবরূপে

নির্মাণ করে বা বিপথগামী করে ছাড়ে। হাসান ইবনে সবার জীবনের ভিত্তি সেদিন থেকেই এক বিশেষ সাচে নির্মাণ শুরু  যেদিন তার বাবা তাকে আবদুল মালিক ইবনে আতাশের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাে। আবদুল মালিক তার বাবাকে ভালাে করেই চিনতাে। যেমন এক দেহের দুই হাত একে অপরকে চেনে। আলী ইবনে আহমদের ধূর্ত স্বভাবের কথাও আবদুল মালিক জানতাে জ্যোতিষবিদ্যা ও জাদু বিদ্যায় আবদুল মালিক খুবই পারঙ্গম ছিলাে। ইবনে আতাশ বুঝে নিও '-আলী ইবনে আহমদ আবদুল মালিকের সামনে

বসতে বসতে বলেছিলাে- ‘ আমার একটিই মাত্র ছেলে। আমি চাই না আমার মৃত্যুর পর কোন আঁধারে সে হারিয়ে যাক। আমি যতটুকু পরিচিত হয়েছি সে যেন এর চেয়েও অনেক বেশি পরিচিত হয়।

‘ জীবনের এই একটা দিক তােমার সামনে থেকে দেখতে চেষ্টা করাে আলী!- ইবনে আঁতাশ বললাে- ‘ তুমি তাে এতটুকুই পরিচিত হয়েছে যে, এক হাকিমের সঙ্গে।তােমার উঠাবসা আছে। কিন্তু এটা তৃপ্ত হওয়ার মতাে কোন বিষয় নয়।  ইবনে আতাশ! এটাও এক ধরনের পরিচিতি। আমি বলছি সে অনেক নাম

করবে, .. ভালাে অথবা মন্দ। ' ঠিক আছে, ছেলেকে ভেতরে নিয়ে এসাে। আলী ইবনে আহমদ ছেলে হাসানকে ভেতরে নিয়ে গেলাে এবং আবদুল মালিক

ইবনে আতাশের সামনে বসিয়ে দিলাে। হাসানের মাথায় ছােট একটি পাগড়ি বাধা ছিলাে। আবদুল মালিক পাগড়িটি সরিয়ে তার মাথায় এমনভাবে হাত রাখলাে যে, তার আঙ্গুলগুলাে হাসানের কপাল জুড়ে ছড়ানাে ছিলাে। আস্তে আস্তে আঙ্গুলগুলাে তার

কপালে ফেরাতে লাগলাে। তারপর হাসানের মুখটি তার দুহাতের মাঝখানে রেখে।ওপর করে ধরলাে এবং হাসানের চোখে চোখ রেখে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাে।কিছুক্ষণ। এরপর হাসানের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলাে। চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই আবদুল মালিক তার মাথা এক ঝটকায় এমনভাবে পেছনে সরিয়ে নিলাে যেন এই ছেলের হাত থেকে আচমকা সাপ বেরিয়ে এসেছে। আবদুল মালিক এরপর একটি কাগজ কলম নিয়ে কয়েকটি বৃত্ত আঁকলাে এবং প্রত্যেকটা বৃত্তে কিছু একটা লিখলাে। আর থেমে থেমে হাসানের মুখের ওপর চোখ

বুলালাে এবং বিড়বিড় করে কি যেন বললাে।

‘ যা বেটা তুই বাইরে গিয়ে বােস ’-ইবনে আতাশ হাসানকে ছেড়ে দিয়ে বললাে। যা বলার বলে ফেললা ইবনে আতাশ! ’-আলী বললাে- ' আমি জানি তুমি যা

বলবে তা তােমার জ্ঞান আর গণনার নক্ষত্রই বলেছে।'

‘ তােমার স্ত্রীর পেট থেকে এক নবী জন্মেছে '।

‘ নবী?'-আলী হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাে- নবুওয়তের পথ তাে বন্ধ হয়ে গেছে। নবুওয়তের পথ বন্ধ হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ' -'ইবনে আতাশ বললাে আল্লাহর বান্দাদের পক্ষ থেকে এই পথ বন্ধ হয়নি, কখনাে বন্ধ হবে না। এ পর্যন্ত।তাে কত লােকই মিথ্যা নবীর দাবী করেছে। তুমি সাফ ইবনে সয়াদের নবী হওয়ার।কথা শােননি? সে ছিলাে ইহুদী। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশাতেই সে নবী দাবী করেছিলাে এবং রাসূল (স) এর সঙ্গে তার সাক্ষাতও হয়েছিলাে। রাসূল (স) একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তােমার ওপর কি ওহী

নাযিল হয়? সাফ ইবনে সয়াদ জবাব দেয়। আমার কাছে একজন সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী আসে। ' সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর অর্থ কি?-আলী জিজ্ঞেস করলাে। অর্থ বােঝার চেষ্টা করে। এর অর্থ হলাে আমার কাছে একজন ফেরেশতা এবং এক শয়তান আসে। সে যা বলতে চাইতাে তা হলাে, ফেরেশতাও এবং শয়তানও ইংগিতে নিজেদের অদৃশ্য বার্তা তাকে জানিয়ে যেতাে। আসলে ইবনে সায়াদ জাদু বিদ্যায় পারদর্শী ছিলাে। এই বিদ্যার ভেদ আমার কাছেও আছে। আমিও জাদুকর। কিন্তু এই বিদ্যায় ইহুদীরা

এতই পারদর্শী যে, তারা একে অনেক শক্তিশালী ভেদে রূপান্তরিত করেছে এবং এর মধ্যে শয়তানী মন্ত্র ভরে দিয়েছে। ওদের জাদু সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। ইবনে সয়াদও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতাে। সে বলতাে তার কাছে এক ফেরেশতা আসে; যে তাকে খােদার পয়গাম দেয় এবং এক ইবলিস আসে, যে তাকে ভবিষ্যতের খবর দেয় তুমি আমার ছেলে সম্পর্কে বলছিলে ’-হাসানের বাবা বললাে- ‘ সে কোন

ধরনের নবী হবে?' অন্যরা যেভাবে নবী বনেছে ’ – ইবনে আতাশ বললাে- “ তুমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু

আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শেষ নবী মাননা আর না মানাে আমি কিন্তু এই হাদীস অস্বীকার করতে পারবাে না যে- মুহাম্মদ (স) বলেছেন-“ মিথ্যা নবীর দাবীদাররা

ক্রমাগত আসতেই থাকবে। তারা তােমাদের সামনে এমন এমন কথা বলবে যা তােমরা তাে দূরের কথা তােমাদের বাপ দাদারাও শশানেনি। তাদের কাছ থেকে সতর্ক থেকো। আর তােমাদের ঈমান তাদের কাছ থেকে হেফাজতে রেখাে। এরা তােমাদের

পথভ্রষ্টতা ও ফেতনা ফাসাদে জড়াবে ' ...। তুলাইহা আসাদী নবুওয়তের দাবী করেছিলাে। মুসায়লামা, কাযযাবের নাম তাে তুমি শুনেছাে। এরপর এক মহিলা- সাজ্জা বিনতে হারিসও নবুওয়তের দাবী করেছিলাে ... তারপর কি হলাে? শােনা যায় সাফ

ইবনে সয়াদ ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিলাে। তুলায় মুসলমান হয়ে গিয়েছিলাে। নবী দাবী করে সে যত কুখ্যাতি পেয়েছিলাে এর চেয়ে অনেক বেশি প্রসিদ্ধি ও খ্যাতির মালা পেয়েছিলাে মুসলমানদের যুদ্ধের ময়দানে। তুমি যদি ভবিষ্যতের পর্দা উঠাতে পারাে ’-আলী ইবনে আহমদ চঞ্চল হয়ে বললাে- তাহলে বলাে আমার ছেলের ভবিষ্যত কি হবে? তার পরিণতি কোথায় তাকে দিয়ে যাবে? মানুষকে যে কোন পরিণতিতে পৌছায় তার স্বভাব। পরিণাম ভালােও হতে পারে মন্দও হতে পারে। এটা নির্ভর করে তার কর্মের ওপর। আমি তােমার ছেলের দেখে প্রতিফলিত ছবি যদি ভুল না দেখে থাকি তাহলে সে এত শক্তির অধিকারী হবে বে, যার চোখে চোখ রেখে সে তাকাবে সে তার সামনে সিজদায় পড়ে যাবে এবং যে..............(চলবে)