জিকিরের ফজিলত
লেখক:মাওলানা শেখ জাবির আহমদ আল-হোসাইনী
==========
জিকিরের    ফজিলত   ও   মাহাত্ম     সম্পর্কে   হযরত   নবী করীম   সাল্লাল্লাহু    আলাইহি   ওয়াসাল্লাম     এর   অসংখ্য হাদীস    রয়েছে।    তন্মধ্য   হতে   মাত্র   কয়েকটি   হাদীস  এখানে     উল্লেখ   করা   হল।   হাদীছে   কুদসীতে   আছে- আল্লাহ   তায়ালা   বলেন-    বান্দা   আমার      প্রতি    যেরূপ ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে তদরূপ ব্যবহারই করে   থাকি।  যখন  কোন  বান্দা  আমার   জিকির   করে, আমি  তখন  তার  সঙ্গে থাকি।    যদি সে  আমাকে  মনে  মনে      স্মরণ   করে,   আমিও  তাহাকে  মনে  মনে  স্মরণ  করি।  যদি   সে   কোন   মজলিসে   আমাকে  স্মরণ  করে, তবে   আমি   তাকে   তদপো   উৎকৃষ্ট      মজলিসে   স্মরণ  করি।     যদি    সে    আমার     রহমতের    দিকে    অর্ধ    হাত পরিমাণ অগ্রসর হয়, আমার  রহমত পূর্ণ একহাত তার দিকে   অগ্রসর  হয়।  সে  যদি   সাধারণ  গতিতে   আমার রহমতের দিকে  হেঁটে অগ্রসর হয়, আমার রহমত দ্রুত তার    দিকে    অগ্রসর    হয়    (মেশকাতশরীফ)।    হযরত  আবুদারদা  আনছারী  রাদিয়াল্লাহু   আনহু    হতে   বর্ণিত- একদা       হযরত       নবী      করীম       সাল্লাল্লাহু       আলাইহি ওয়াসাল্লাম  সাহাবীগণের   উদ্দেশে  ফরমান-   আমি    কি তোমাদের  এমন একটি কাজের সন্ধান দিব, যা আমল হিসাবে সর্বোৎকৃষ্ট, আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি পবিত্র কাজ, তোমাদের      মরতবা      বুলন্দকারী      হিসাবে      সর্বশ্রেষ্ট,  আল্লাহর রাস্তায়  সোনাচান্দি  ব্যয় করা কিংবা জেহাদের ময়দানে      বিধর্মীদের            মুন্ডপাত      করা      ও        নিজে শাহাদতবরণ   করার  চেয়েও   উত্তম,  সাহবীগণ  আরজ  করলেন,    হাঁ    বলুন-    তখন    তিনি    বললেন,    তা    হল  আল্লাহর জিকির। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্)

হযরত   মায়াজ  রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে  বর্ণিত- হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- মানুষ যত রকম নেককাজই     করুক     না     কেন,     কবর     আজাব     হতে  মুক্তিলাভের ব্যাপারে আল্লাহর জিকিরই সবচেয়ে বেশি সহায়তা করবে। (আহমদ)

মানুষ যখন   শোয়ার জন্য  নিজ বিছানায়   আসে,  তখন  সঙ্গে  সঙ্গে    ফিরিশতারা  ও শয়তান  তার কাছে আসে,  ফিরিশতা বলে স্বীয় আমল  ভাল কাজ  দ্বারা  শেষ   কর, আর  শয়তান বলে মন্দ কাজ দ্বারা শেষ কর। অতঃপর  সে   যদি   আল্লাহর  জিকির  করে  শুয়ে     পড়ে,  তাহলে    সারারাত    ফিরিশতা  তাকে   হিফাজত  করেন,  যদি  সে খাট   থেকে   পড়ে   মরে  যায়,  তাহলে   জান্নাতে    প্রবেশ করবে। (হিসনে হাসিন)

ঘটনা:       হযরত    নূহ    আলাইহিস    সালাম     যখন     স্বীয় জাতিকে    আল্লাহর    পথে   ডাকতে   ডাকতে    অবশেষে   নিরাশ হয়ে  পড়লেন তখন আল্লাহ  তায়ালার দরবারে    এই মর্মে দোয়া করলেন-

رب لاتذرعلى الارض من الكافرين ديار

অর্থাৎ   হে   আমার    রব!   এই   মাটির   পৃথিবীতে   কোন  কাফেরকেই  আর তুমি জীবিত রেখ না। নির্দেশ এলো, খুব শীঘ্রই  ভয়ঙ্কর এক  তুফান  সংঘটিত   হবে। তুফান  সবকিছু   ধ্বংস    করে   দেবে।  শুধু  তোমার    প্রতি   যারা ঈমান     এনেছে   তারাই    মুক্তি   পাবে    এই     ধ্বংসলীলা থেকে। অতঃপর তুমি একটি কিশতি তৈরি কর।   এতে তুমি   ও  তোমার     অনুসারী   মুমিনরা   আশ্রয়   নিবে   ও  আত্মরা করবে।

সেকালে  আল্লাহ   ভীরু  সৎ   ও  বিশ্বাসী  এক  বৃদ্ধ  নারী  ছিল। সে তার ঝুপড়িতে বসে সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করত। তারপর যখন তুফান শুরু হলো- নূহ আলাইহিস সালাম     সকল    মুমিনকে    কিশতিতে   ওঠালেন।    ভুলে গেলেন   শুধু  এই  বৃদ্ধার   কথা।  ওয়াদা   মাফিক  তুফান এলো।  এতে কাফের সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি  সব লণ্ডভণ্ড হয়ে   গেল।   তুফান      থেমে   যাওয়ার    পর    হযরত   নূহ আলাইহিস সালাম এর মনে পড়ল সে বৃদ্ধার কথা।

তার  খুবই  দুঃখ  হলো। আফসোস করতে  করতে তার  ঝুপড়িতে গেলেন। গিয়ে দেখেন সে আরামে  বসে বসে আল্লাহ আল্লাহ করছে। নূহ আলাইহিস সালাম  এর তো তাজ্জবের   শেষ নাই।   আল্লাহ  তা’য়ালার দরবারে  হাত তুলে জানতে চাইলেন, খোদা  হে! এ  কেমন   রহস্যময় তা  আমাকে বলে  দাও না? এরশাদ হল- নূহ! এ হলো ‘ফাযকুরুনী     আযকুরুকুম’     এর    বাস্তব     নমুনা।     বুড়ি আমাকে  ভুলেনি,  আমি  তাকে  ভুলব  কী     করে?    এই  ঘটনা দ্বারা এ কথাই প্রতিভাত হয়, ইবাদতের দ্বারা শুধু পরকালীন        কল্যাণই        নয়,        পার্থিব        জান-মালের   সংরক্ষণও হয়।

ঘটনা: এক শহরে কয়েকজন ডাকাত ঢুকল। ঢুকে তারা পরস্পরে  পরামর্শ  করল।   খুব   সাবধানে  কাজ  করতে হবে যাতে ধরা না পড়ি। পরামর্শে ডাকাতদের  সরদার বলল-   তোমরা   সকলে   দরবেশের   বেশ   ধরে   ফেল।  সবাই বলল- এটা কীভাবে করব। সকলে কাপড় রঙিন করে    নাও।    তারপর      প্রত্যেকে    হাতে     একটি     করে তাসবীহ   নিয়ে  সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ  করতে  থাক। যেখানেই    যাবে,    জপ  ঐ   একটাই   সুবহানাল্লাহ।  এর বাইরে কোন শব্দই উচ্চারণ করবে না।

পরামর্শ           মাফিক        শহরে        প্রবেশ        করে         একটি অতিথিশালায়  আশ্রয় নিল এবং বৃত্তাকার হয়ে সকলেই সুবহানাল্লাহ   তাসবীহ  জপতে       লাগল।  তাদের  মুখে   তখন অন্য কোন  শব্দ নেই। সরদারের হাতে   সবচেয়ে বড় ও লম্বা তাসবীহ।

এদিকে        সমগ্র          শহরে        সংবাদ        ছড়িয়ে         পড়ল  অতিথিশালায়   বিদেশ   থেকে   এক   দরবেশ   এসেছে।  বিশাল জামাত সঙ্গে। তারা আল্লাহর জিকির ছাড়া আর কোন কথাই মুখে আসে না।

এবার    দলে   দলে    সাক্ষাতে    আসতে    লাগল    মানুষ। মুসাফা  করছে।  নিজেদের  সমস্যাবলীর  কথা   বলছে।  অবশেষে   সে অঞ্চলের   বাদশাহ পর্যন্ত  একদিন বিরাট  ফৌজসহ  দরবারে  এসে  হাজির।   এসে   আরয  করল- দরবেশ সাহেব! আপনার ফয়েজলাভে ধন্য হব। তিনি  দরবেশকে  তার   দলসহ   দাওয়াত  করলেন।    দরবেশ  দাওয়াত কবুল করে নিলেন।

এদিকে বাদশাহর   এক  পুত্র দীর্ঘদিন যাবৎ পাঘাতগ্রস্ত ছিল।

বহু     চিকিৎসা     করিয়েছেন।     কাজ     হয়নি     কিছুই     ।  খানা-পিনার পর  বাদশাহ   দরবেশ সাহেবের খেদমতে আরজ   হুজুর!   আপনিতো    আল্লাহ    তা’য়ালার    বিশেষ  মাকবুল  বান্দা!    আপনি  দয়া  করে     আল্লাহ   তা’য়ালার দরবারে দোয়া করে দিন, যাতে তিনি মেহেরবাণী করে আমার   এ  ছেলেকে  সুস্থ  করে  দেন।   আমার  জীবনের এটাই শেষ স্বপ্ন।

অবশেষে  দরবেশ তার  সঙ্গীদেরসহ   আল্লাহর দরবারে হাত তুলে নেহায়েত বিনয়ের সাথে কাঁদতে লাগল!  হে  আল্লাহ     আমরা     সকলই      পাপী,      গোনাহগার।     কিন্তু এতেতো কোন  সন্দেহ নাই, আমরা তোমারই   বান্দা। তোমার   দরবার  ছেড়ে  আমরা   যাব  কোথায়!  কোথায়  গিয়ে  কাঁদব  আমরা।   আজ   আমাদের  ইজ্জত   রাকারী একমাত্র তুমি মাওলা।

ডাকাতদল   কান্নায়   ভেঙ্গে     পড়েছে   রহমান    রাহীমের দরবারে।   ওদিকে    রহমতের    দরিয়ায়    জোস   ওঠেছে প্রবলভাবে। দুয়া  কবুল হল।  সঙ্গে  সঙ্গে শাহজাদা  সুস্থ হয়ে উঠল।

এই   অবস্থা  দেখে  দরবেশ   মনে  মনে  ভাবতে  লাগল। হায়!   মানুষকে   ধোকা   দেয়ার   জন্যে   দরবেশির   বেশ  ধরছিলাম।  এই  ভণ্ডামির  যদি  এই  ফসল  হয়  তাহলে  সত্যিকার অর্থে  এখলাসের সাথে  যদি আল্লাহকে ডাকি তাহলে   তার    ফসল  কত  ব্যাপক   ও   অধিক  হবে   তা  কেবল আল্লাহই  জানেন। একথা বলে সকলেই আল্লাহু আকবার   বলে   চিৎকার   করে   ওঠল।   শহরের   নিভৃত  অঞ্চলে   গিয়ে   আল্লাহর    স্বরণে   মশগুল   হয়ে      পড়ল। বর্ণিত আছে, পরে তারা সকলেই পূর্ণ ওলী হয়ে যায়।

হাফেজ ইবনে কাইয়েম তাঁর   রচিত ‘আল- ওয়াবেলুছ   ছাইব’  কিতাবে জিকিরের এক   শতাধিক  উপকারিতার কথা উল্লেখ করেছেন।  তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে    বর্ণনা  করা হল-

১. জিকিরের ফলে  শয়তান বিতাড়িত হয়।
২. অন্তর হতে পাপের কালিমা মুছে যায়।
৩.    মানসিক   অবসাদ  দূর    হয়  ও   এবাদতের  প্রেরণা  জাগে।
৪. চেহারা নুরানী ও জোতির্ময় হয়।
৫. জীবিকার প্রাচুর্য ও উপার্জনে বরকত লাভ হয়।
৬. আল্লাহ তায়ালার  রেজামন্দী ও সন্তোষ লাভ হয়।
৭. আল্লাহ তায়ালার কুদরত বা নৈকট্যলাভ হয়।
৮. মারেফাত ও হাকীকতের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
৯. চারিত্রিক দুর্বলতা দূর ও চারিত্রিক উৎকর্ষ লাভ হয়।
১০.     দুনিয়ার    প্রতি     অনাসক্তি    ও     পরকালের    প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়।
১১.    তাকদীরের    খারাবী     দূর    হয়ে     সৌভাগ্য    নেমে আসে।
১২. সমাজে মকবুলিয়ত ও জনপ্রিয়তা লাভ হয়।
১৩. ফেরেশতাদের সাহচর্য ও দোয়া লাভ হয়।
১৪. দুনিয়ায় থাকতেই স্বর্গসুখ লাভ হয়।
১৫. পরকালে বিশেষ মরতবালাভের উপযুক্ত বিবেচিত হয়।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! তরিকা অনুযায়ী জিকির করলে সহজে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছা সহজ হবে বিধায়  তরিকা অনুযায়ী জিকির    করতে  হবে।     চার  তরিকার  জিকিরের   বর্ণনা আমার       শ্রদ্ধেয়     ওয়ালিদ     ছাহেব     কিবলার       লিখিত আমালুল     মুছলিমীন      কিতাবে     বিস্তারিত       আলোচনা করেছেন।  বিশদভাবে  জানতে  হলে  কিতাবখানা  পাঠ  করার   অনুরোধ   করছি।   এখানে   আমালুল   মুছলিমীন  থেকে জিকিরের কিছু নিয়মাবলী হুবহু তুলে ধরেছি।