হুযুর (আলাইহিস সালাম) এর জন্মের আগে পৃথিবীর অবস্থা
লেখক:আল্লামা আবেদ নিজামি



image:pixabay.com


আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যখন দুনিয়াতে তশরীফ আনেন, তখন দুনিয়ার নৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ওই সময় রাজনৈতিক দিক দিয়ে ইরান ও রোমকে খুবই শক্তিশালী ও উন্নত সাম্রাজ্য মনে করা হতো। ইরান সাম্রাজ্য ইরাক থেকে শুরু করে হিন্দুস্থানের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং ওখানকার লোকেরা মজুসী, অর্থাৎ পারসীক ধর্মাবলম্বী ছিল।  রোম সাম্রাজ্য ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা পরিবেষ্টিত ছিল এবং তথাকার লোকেরা ঈসায়ী অর্থাৎ খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী ছিল। 

ইরানঃ 
ওই সময় ইরানের লোকেরা তাঁরকারাজির পূজা করতো ৷ এছাড়া বাদশাহ ও উজীরদেরও পূজা করতো। লোকেরা নিজেরাই বিভিন্ন আকারের মূর্তি তৈরী করে ওগুলোকে সিজদা করতো। মোট কথা ওরা খোদা ব্যতীত দুনিয়ার প্রত্যেক শক্তির কাছে মাথানত করতো।

রোমঃ 
রোমেও একই অবস্থা ছিল। তারকা রাজি ও দেবতা সমূহের পূজা করতো। লোকদের মযহাব যদিওবা খৃষ্টবাদ ছিল, কিন্তু ওদের মধ্যে অনেক ফেরকা বিদ্যমান ছিল এবং ওদের মধ্যে সবসময় মারাত্মক যুদ্ধ-বিগ্রহ, লেগেই থাকতো। প্রত্যেক ফেরকার পোপ নিজেকে খোদা মনে করতো এবং ওর অনূসারীরা ওকে সিজদা করতো। ওদের মধ্যে ধর্মীয় উচ্চ মর্যাদার মাপকাটি ছিল সংসার ত্যাগ ৷ 

ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশঃ 
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অবস্থাও একই ছিল। এখানে তেত্রিশ কােটিরও অধিক দেবদেবী ছিল। শক্তি অনুসারে বর্ণ-বৈষম্য বিরাজমান ছিল। মদের ব্যাপক প্রচলন ছিল, শিরক, কুসংস্কার ও নৈতিক অধঃপতন চরম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল। জুয়া ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে ছিল।  লোকেরা নিজেদের স্ত্রীদেরকে রাজি রেখে জুয়া খেলতো।  এক মহিলা কয়েকজন স্বামী গ্রহণ করতো।  যুদ্ধে হারিয়ে যাবার ভয়ে মেয়ে লোকদেরকে স্বয়ং বাপ, ভাই বা স্বামী নিজ হাতে কতল করে ফেলতো। উলঙ্গ নারী পুরুষের পূজা করা হতো এবং এ সব কিছু ইবাদত ও নেকী মনে করা হতো।

আরবঃ 
ওই সময় সারা দুনিয়াতে গোমরাহী ও শিরকের জয় জয়কার অবস্থা ছিল। কিন্তু আরবের অবস্থা অন্যান্য সাম্রাজ্য সমূহ থেকে অধিক খারাপ ছিল। এখানকার অধিবাসীরা মূর্তি, পাথর, বৃক্ষ, নক্ষত্র, ফিরিশতা ও জীনদের পূজা করতো, ওগুলোর নামে বলিদান করতো এবং ওগুলো থেকে নিজেদের বাসনা কামনা করতো। এরা ফিরিশতাগণকে খোদার মেয়ে এবং জীনদেরকে  খোদার প্রিয় পাত্র ও আপনজন মনে করতো।  এ খেয়ালে ওদের মূর্তি তৈরী করে পূজা করতো।  মূর্তি পূজার প্রচলন এত ব্যাপক ছিল যে যদি ওরা রাস্তায় কােন সুন্দর পাথর কুঁড়িয়ে পেত, তখন তারা সেটার পূজা আরম্ভ করে দিত।  সফরে যাত্রা করার সময় সাতু, আটা ইত্যাদির মূর্তি তৈরী করে সাথে রাখতাে।  ওগুলোর পূজাও করতো এবং ক্ষুধা লাগলে খেয়েও পেলতো।  এ ছাড়া চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজির পুজাও করা হতো। 

বর্বরতার এমন অবস্থা ছিল যে, নগন্য বিষয় নিয়ে মারাত্মক গৃহযুদ্ধ লেগে যেত এবং এ গৃহযুদ্ধ বংশ পরম্পরায় চলতেই থাকতো। আরবে জুয়া খেলা ও মদপান দুনিয়ার অন্যান্য এলাকা থেকে অধিক ছিল।  সুদ, লূটপাট, যেনা ও অন্যান্য মন্দ কাজেরও কোন কমতি ছিল না।  এ সব লোকেরা নিজেদের মেয়েদেরকে জীবিত কবর দিত। নির্লজ্জ ও বেহায়াপনা এমন স্তরে পৌছে গিয়েছিল যে, নারী পুরুষেরা ঊলঙ্গ হয়ে খানায়ে কাবার তােয়াফ করতো এবং এ গর্হিত কাজকে রেহায়াপনার পরিবর্তে নেক কাজ মনে করতো।  মূর্তিদের উদ্দেশ্যে মানুষ বলি দিত।  সৎমাকে বিবাহ করতো।  একজন লোক যত ইচ্ছে তত বিবাহ করতে পারতো। 

পরিশেষে এ সম্প্রদায়ের কাছে আল্লাহ তাআলা ২০শে এপ্রিল ৫৭০ খৃষ্টাব্দে আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে প্রেরণ করেন যেন তিনি (সাল্লাল্লাহ আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আরব এবং দুনিয়ার অন্যান্য জায়গা সমূহ থেকে মন্দকাজ সমূহকে নির্মূল করেন এবং সকল মানুষকে নেকী ও সৎপথ প্রদর্শন করেন।