মাসীহা'র আগমন : জেরুজালেমে ইহুদিদের পরিকল্পনা
- হাফিজ মারজান আহমদ চৌধুরী।
প্রতিটি বছর ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হামলা ও নির্যাতন একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক'দিন পরপর ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমি থেকে কিছু অংশ দখল করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপন করে। প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিরা বিক্ষোভ করে। সেই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে গুলি ও বিমান হামলা চালায়। ফিলিস্তিন নামক এক সময়কার বৃহৎ আরব এলাকাটি আজ মাত্র দুটি খণ্ডাংশে দাঁড়িয়ে আছে। একটি অংশ ইসরায়েলের পশ্চিম দিকে মিশরের পার্শ্ববর্তী গাজা উপত্যকা (হামাস নিয়ন্ত্রিত), আরেকটি অংশ পূর্বদিকে জর্ডানের সাথে লাগোয়া পশ্চিম তীর (PNA নিয়ন্ত্রিত)। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে পশ্চিম তীর ফিলিস্তিনের ভূমি হিসেবে স্বীকৃত, তবুও প্রতিনিয়ত ইসরায়েল সেখানে ইহুদি বসতি নির্মাণ করেই যাচ্ছে।
তবে সবকিছু ছাড়িয়ে মূল ঝগড়াটি জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের পবিত্র স্থান জেরুজালেম আন্তর্জাতিক ভূমি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। যদিও ইসরায়েল সেখানে কব্জা করে রেখেছিল, তবে কাগজে-কলমে এর কর্তৃত্ব ছিল তিনটি কর্তৃপক্ষের হাতে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা দেয়ার পর ইসরায়েল পুরো জেরুজালেম দখল করার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এক সময় মুসলিম বিশ্ব ফিলিস্তিনের ব্যাপারে সজাগ থাকলেও এখন আর তা নেই। বর্তমানে ইসরায়েল একটি পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্র। আরব রাষ্ট্রগুলো এখন পড়িমরি করে ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্ব করতে ব্যস্ত। মাঝখান থেকে নিজভূমে পরাধীন ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতার আন্দোলন ভাটা পড়ে গেছে। ফিলিস্তিনিরা আজ একা, অসহায়, নিঃসঙ্গ।
তবে ইহুদিদের লক্ষ্য কেবল পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের আসল উদ্দেশ্য আরও গভীর। সেটি বলার আগে সংক্ষিপ্তভাবে ইহুদিদের ইতিহাসে একবার আলোকপাত করা উচিৎ।
ইবরাহিম আ. এর নাতি ইয়াকুব আ. এর বংশধরকে ইতিহাসে বনী ইসরাইল নামে আখ্যায়িত করা হয়। ইউসুফ আ. যখন মিশরের দায়িত্বে ছিলেন, তখন দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে বনী ইসরাইল শাম দেশ ছেড়ে মিশরে চলে গিয়েছিল। কালের পরিক্রমায় ফেরাউনরা মিশরের ক্ষমতায় আসে এবং ইহুদিদেরকে সেখানে দাস বানিয়ে দেয়। এরপর মুসা আ. এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে উদ্ধার করে আবার তাদের পিতৃভূমিতে ফিরিয়ে এনেছিলেন, তাদেরকে তাওরাত কিতাব দিয়েছিলেন, একটি উম্মাতের মর্যাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কারণে শাস্তিস্বরূপ তখন তাদেরকে জেরুজালেম থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। মুসা আ. এর ইন্তেকালের পর বাদশা তালুতের নেতৃত্বে তারা আমালিকা সম্প্রদায়কে পরাজিত করে এবং জেরুজালেমে একটি ইসলামী শাসন কায়িম করতে সক্ষম হয়। তালুত, দাউদ আ. এবং সুলাইমান আ.— এ তিনজনের নেতৃত্বে বনী ইসরাইলের সেই সোনালী যুগ চলেছিল দীর্ঘ ৯৪ বছর। এরপর আন্তঃকলহের দরূণ তাদের সম্রাজ্য দুইভাগ হয়ে পড়ে এবং শক্তি কমে যায়।
বনী ইসরাইলের ওপর প্রথম বড় আঘাত এসেছিল ৭৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আশুরি সম্প্রদায়ের হাতে। এরপর ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাদনেজার জেরুজালেম হামলা করে সবকিছু তছনছ করে দেয়। প্রায় ৬ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করে, সমপরিমাণ ইহুদিকে বন্দী করে, তাওরাত জালিয়ে দেয় এবং সুলাইমান আ. এর নির্মিত মসজিদ (১ম হাইকাল) ভেঙ্গে দেয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় বন্দীদশায় থাকার পর ইহুদিরা যখন ব্যাবিলন থেকে জেরুজালেমে ফিরে আসে, তখন তারা নিজেদের স্মরণশক্তি থেকে তাওরাত কিতাব পুনলিখন করে। ইহুদিরা তখন থেকেই একজন মাসীহা তথা ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় আছে, যিনি তাদের গৌরবোজ্জ্বল যুগ আবার ফিরিয়ে আনবেন। ১ম খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীতে আসেন সেই মাসীহা, ঈসা ইবন মারইয়াম আ.। কিন্তু আল্লাহর নিয়ামতে অকৃতজ্ঞ বনী ইসরাইল জাতি ঈসা আ.-কে আল্লাহর রাসূল কিংবা মাসীহা কোনোটাই স্বীকার করতে রাজি হয়নি। উল্টো তাঁকে যাদুকর ও মুরতাদ ফতোয়া দিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করে। ৩৩ খ্রিস্টাব্দে আল্লাহ তাঁকে জীবন্ত আসমানে উঠিয়ে নেন। মোটকথা, ইহুদিদের অভ্যাস হচ্ছে, তারা আল্লাহর নিয়ামতের অপেক্ষায় থাকে। তবে নিয়ামত আসার পর সেটিকে অগ্রাহ্য করে।
৭০ খ্রিস্টাব্দে ইহুদিদের ওপর তৃতীয় আঘাত আসে রোমানদের হাতে। রোমান সেনাপতি টাইটাস ইহুদিদের আবাসভূমিতে হামলা করে কয়েক লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করে, ইহুদিদের ইবাদতগাহ ২য় হাইকাল ধসিয়ে দেয় (কেবল একটি দেয়াল ব্যতীত, যেখানে গিয়ে আজ ইহুদিরা কান্নাকাটি করে) এবং বাকি ইহুদিদেরকে জেরুজালেম থেকে চিরতরে বিতাড়িত করে। ৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইহুদিরা নিজেদের আবাসভূমি ছেড়ে দুনিয়ার এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে থাকে। সে সময়টি ইহুদি ইতিহাসে Diaspora নামে খ্যাত।
উমর রা. এর খিলাফতকালে ৬৩৬-৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা জেরুজালেম বিজয় করেন। স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি না দিলেও মুসলমানরা ইহুদিদেরকে জেরুজালেমে যাওয়া-আসা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে, যা সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় বিজয় করে নেন। এরপর জেরুজালেম চলে আসে উসমানি (অটোমান) সালতানাতের হাতে। ১ম বিশ্বযুদ্ধে এটি ব্রিটিশদের হস্তগত হয়। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বালফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিন এলাকায় বসবাস করার অনুমতি দেয়। ৭০ থেকে ১৯১৭— দীর্ঘ সাড়ে আঠারোশ বছরের Diaspora শেষে ইহুদিরা আবার ফিলিস্তিনে এসে বসতি গড়তে শুরু করে। ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে কিনে, আবার কখনও জোরপূর্বক দখল করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনের ভূমি নিজেদের কব্জায় নিতে শুরু করে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর আসে চতুর্থ বড় আঘাত। জার্মান শাসক এডলফ হিটলার সে সময় প্রায় ৬০ লাখ (তাদের তথ্য অনুযায়ী) ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিশ্বযুদ্ধের শেষে সারা দুনিয়া থেকে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসতে থাকে এবং ব্রিটেন ও আমেরিকার সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালে তারা ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূমিতে ইসরায়েল নামক একটি রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। এরপর মোট ৪ বার প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধে জড়ায়। তবে প্রতিবারই ইসরায়েল বিজয়ী হয়।
বলছিলাম, জেরুজালেমে ইহুদিদের মূল পরিকল্পনার কথা। ইহুদিরা আজও বিশ্বাস করে যে, তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য একজন মাসীহা আসবে। আমিও বিশ্বাস করি, তাদের একজন মাসীহা আসবে। সেই 'মাসীহা' হবে দাজ্জাল। হাদীসে এসেছে, দাজ্জাল আবির্ভূত হওয়ার পর ইহুদিরা তার সঙ্গী হবে [মুসনাদে আহমাদ]। মোটকথা, ইহুদিরা এখন দাজ্জালের প্রতিক্ষায় আছে।
ইহুদিদের মধ্যে দুটি ভাগ রয়েছে- ধার্মিক ও সেক্যুলার। সেক্যুলার ইহুদিরা এসব কথা তেমন বিশ্বাস করে না। তাই তারা মাসীহা'র অপেক্ষা না করে নিজেরাই দুনিয়া দখলে ব্যস্ত। ভূমি দখল করতে না পারলেও পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আজ ইহুদিদের হাতের মুঠোয়। অপরদিকে ধার্মিক ইহুদিরা আপাতত কিছুই করতে নারাজ। এমনকি তারা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বিরোধী ছিল। তাদের বিশ্বাস, মাসীহা আসার পর এই সবকিছু হবে।
ধার্মিক ইহুদিদের বিশ্বাস, তারা যখন টেম্পল মাউন্ট এলাকায় ৩য় হাইকাল (Third Trample) নির্মাণ করবে এবং সেখানে দাউদ আ. এর সিংহাসন এনে রাখবে, তখন আসবে তাদের কাঙ্ক্ষিত মাসীহা। দাউদ আ. এর সিংহাসন (Throne of David) হচ্ছে সেই পাথর যেখানে বসে দাউদ আ. এর রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। এটি এখন ইংল্যান্ডের কাছে সংরক্ষিত। তবে ইহুদিদের মাথাব্যথা সেটি নয়। তাদের মাথাব্যথা হচ্ছে, টেম্পল মাউন্ট এলাকাজুড়ে মাসজিদুল আকসা কমপ্লেক্স অবস্থিত। ৩য় হাইকাল বানাতে হলে এই পুরো কমপ্লেক্সটি ভাঙ্গতে হবে। অতএব তাদের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে, মাসজিদুল আকসা কমপ্লেক্স ভেঙ্গে ফেলা। তারা সে লক্ষ্যেই এগুচ্ছে। ১৯৬৭ সালের পর থেকে তারা বারবার মাসজিদুল আকসা ভাঙ্গার চেষ্টা করে আসছে। এক সময় হয়তো সফল হয়ে যাবে। নিচে একটি বোমা পুতে রেখে, অথবা কৃত্রিম ভূমিকম্প করিয়ে তারা পুরো কমপ্লেক্সটি ধসিয়ে দিতে পারে। খুব বড় কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। মুসলিম উম্মাহ আজ এতটাই নিস্তব্ধ যে, মাসজিদুল আকসা ধ্বসে গেলেও আমাদের হাতের পিঠের লোমটিও নড়বে না। যদি সত্যিই এরকম কিছু হবার থাকে, তাহলে আমার মনে হয় না যে, এতে খুব একটা দেরি হবে।
মনে রাখতে হবে যে, আমাদের হারানোর পালা এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও অনেক কিছু হারাতে হবে। তবে একদিন ফিরবে মুসলমানরা। বিশ্বাস করুন, একদিন জেরুজালেম আমাদের হবে। হাদীসে এসেছে, খোরাসান থেকে কালো পতাকাবাহীরা বের হয়ে এ্যালিয়া তথা জেরুজালেমে গিয়ে অবস্থান নেবে। কোনো কিছুই তাদের গতিরোধ করতে পারবে না [সুনান আত-তিরমিযি]।

0 মন্তব্যসমূহ