হালাকু খান কতৃক বাগদাদ দখল


১২৫৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী মোঙ্গল বাহিনি বাগদাদে প্রবেশ করলো। চেঙ্গিজ খানের নাতি হিসাবে যা করা দরকার, হালাকু খান তাই করলেন। তিনি ঘোসনা দিলেন, শহরের বাহাসের ময়দান ও শহরের প্রাচীরের বাহিরে দজলার তীরে যারা সমবেত হবে,তাদের হত্যা করা হবে না। নেতৃত্বহীন লাখো মানুষ দ্রুত ময়দানের দিকে ছুটল।

image :pixabay.com

ময়দানে যাওয়ার পর একে একে সবাই কে বাধা হলো। তারপর শুরু হলো পৃথিবীর ইতিহাস ভয়ংকরতম গনহত্যা গুলোর একটি। দজলার তীরে মুহুর্রে মুহুর্তে মুসলিমদের কাটা মুন্ডু ছিটকে ছিটকে পড়ছিলো মোঙ্গল বাহিনির তলোয়ারের ঘায়ে। হালাকু খান বাগদাদ লুট করার নির্দেশ দিলেন। ভুক্ষুক জানোয়ারের মত বাগদাদের উপর ঝাপিয়ে পড়লো তার সেনারা।

শহরের ভিতর সামান্য কিছু লোক সিধান্ত নিল লড়াই করে শহীদ হবে। তাদের সাথে মোঙ্গলদের লড়াই বেঁধে গেল।

কিছু মহল্লার লোকজন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে কয়েক ঘন্টা টিকে রইল। কিন্তুু এরপর যখন মোঙ্গলরা মহল্লায় ক্যাটাপুল্ট দিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল,তখন জীবন্ত কাবাব হওয়া ছাড়া তাদের আর কোন উপায় রইলো না। 

শিশু ও বৃদ্ধ দের শরীর মাঝখান থেকে দু টুকরো করে ফেলেছিল।

মেয়েদের সঙ্গে যা হলো, তা ছিলো সব চেয়ে যন্ত্রনাদায়ক।

ইচ্ছে মতো ধর্ষন করা হচ্ছিল তাদের। ধর্ষন শেষে ভালো লাগলে বেঁধে মোঙ্গল শিবিরে নিয়ে যাওয়া হত নয়তো মাথা আলাদা করে দেওয়া হত ধড় থেকে।সম্ভবত মোঙ্গলদের দাসী হওয়ার থেকে এটাই সহজ ছিল।

খলিফা আল মুস্তাসিম কে বন্দী করে নিয়ে আসা হলো হালাকু খানের সামনে।

মুস্তাসিমের হেরেম থেকে তার মেয়ে,মা,স্ত্রী এবং দাসী দের বের করে আনা হল। 
তারপর তার সামনে ই তার মা,স্ত্রী দাসীদের গনধর্ষন করে হত্যা করা হলো।

আল মুস্তাসিম চোখের সামনে নিজের পরিবারের লাঞ্ছনা দেখে দিশেহারা হয়ে হাত পা ছুড়ছিলেন। এ ছাড়া তার বিশেষ কিছু করার ছিলো না।

খলিফা মুস্তাসিম কে কি করা হবে,তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন হালাকু খান। তাকে বলা হয়েছিলো খলিফা মহানবী সাঃ এর আত্মীয়, তার রক্ত মাটিতে পড়লে মহা দূর্যোগ নেমে আসবে।

তাই খাঁচায় আটকে রাখা হলো খলিফাকে। 
মার্কোপোলো লিখেছেন,খলিফা কে তার বিপুল ধন-সম্পদসহ, সোনার খাচায় ঢুকিয়ে তালা মেরে রাখা হয়েছিলো।

এদিকে খলিফাকে হত্যা করা নিয়ে হালাকুর দুশ্চিন্তার অবসান ঘটাতে এগিয়ে এলো তার পক্ষে যোগ দেওয়া কিছু শিয়া মুনাফিক।
তারা বললো,খোদ রাসুল সাঃ এর নাতি ঈমাম হুসাইন রাঃ কে যখন হত্যা করা হলো,তখন পৃথিবীতে কোন দূর্যোগ হয়নি। অত,এব খলিফাকে হত্যা করলেও কিছুই হবে না।

এই কথা শুনে হালাকু খান খুশি হলেন,কিন্তুু তার মনের ভয় গেলো না । শেষ মেশ সিধান্ত হলো খলিফাকে গালিচায় মুড়িয়ে তার উপর দিয়ে একশো ঘোড়া চালিয়ে দেওয়া হবে। 
এতে করে রক্ত গালিচায় মেখে থাকবে,মাটিতে পড়বে না। তাহলে কোন প্রকৃতিক বিপর্যয়ের ও ভয় থাকবে না।

বাগদাদ দখলের তিন দিনের মাথায় সোনার খাচায় বন্দী খলিফাকে হালাকু খান জিজ্ঞেস করলেন‚ ‘কি ক্ষুদা পেয়েছে?’

খলিফা বললেন, ‘হ্যাঁ,পেয়েছে।’

হালাকু বললেন,‘তাহলে খাও।’

খলিফা বললেন,‘কি খাবো? এখানে তো কোন খাবার নাই!’

হালাকু বললেন,‘ এই যে বছরের পর বছর যে সম্পদ জমিয়েছ, তা খাও। এই সোনাদানা না জমিয়ে যদি নিজের সেনাবাহিনির পিছনে খরচ করতে,যদি বাগদাদের দেয়ালের পিছনে খরচ করতে, তাহলে আজ আমার দয়ার ভিখারী হয়ে তোমায় মরতে হত না। খাও,আজ তোমার সম্পদ তুমিই খাও।

আল মুস্তাসিম হা করে চেয়ে রইলেন।
তাকে টেনে হিচড়ে বের করে আনা হল।
তারপর গালিচায় মুড়িয়ে ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষে হত্যা করা হল।

অপর্দাথ মুস্তাসিমের মৃত্যু তে জগতের তেমন কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি ঘটেনি।

কিন্তুু বাগদাদের পতন ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন এক আঘাত,যা মানবজাতি কে অনেক অনেক বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।

প্রাচীন যুগ ও মধ্য যুগের পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক সংগ্রশালা ছিলো বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ্।

সেই খলিফা হারুন আর রশিদের সময় থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে গ্রীস,রোম,ইরাক,ইরান,আফগানিস্তান, মিসর, সিরিয়া, তুর্কিস্থান,প্রাচীন ভারত এবং চীনের যাবতীয় জ্ঞান ভান্ডার আব্বাসিয়া খলিফারা সাড়ে চারশো বছর ধরে জমা করে রেখেছিলেন এই বাইতুল হিকমাহতে। এখন থেকে ই মধ্যযুগে মানবজাতির সেরা আবিস্কার গুলো হয়েছিলো । ধারনা করা হয় তৎকালীন পৃথিবীর দশটি বইয়ের নয়টি ছিলো বাইতুল হিকমাতে।

বাগদাদ কোন সাধারন শহর ছিল না। বাগদাদ ছিল একটা প্রতিক। ইসলামি সভ্যতার প্রতীক। খিলাফতের প্রতিক। জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সাংস্কৃতির চরম উৎকর্ষের প্রতিক।

মোঙ্গলদের কাছে এসবের কোন মূল্য ছিলো না । বাগদাদের প্রতিটি দালান কোঠা ধ্বংস করা হয়েছিলো বাইতুল হিকমাহ্ কে বাদ দেওয়া হয়নি

বাগদাদের এই পতনে আনুমানিক প্রানহানীর সংখ্যা ছিল দশ লাখের কাছাকাছি।

ফেরাত নদীর পানি প্রথমে মানুষের রক্তে লাল হলো,তারপর কালো হয়ে গেলো বাইতুল হিকমাহর পুড়ে যাওয়া বইয়ের ছাইয়ে। 
সাত দিন ধরে লুট করার পর লাশের গন্ধে টিকতে না পেরে হালাকু খান বাগদাদ ছেড়ে চলে গেলেন। 
বাগদাদে পড়ে রইলো লাখো মানুষের মাথার খুলি
পঁচা লাশ, পোড়াবাড়ি,  লুট হওয়া ফাকা বাজার দোকান, গুদাম আর ছাই হয়ে যাওয়া লাইব্রেরি।

বাগদাদ আর কোন দিন আগের রূপে ফিরতে পারেনি ।

মধ্যযুগীয় আব্বাসিয়া খেলাফতের কবর তারা নিজেরাই খুড়েছিল গত তিন শতাব্দী ধরে। 
মোঙ্গলদের মাধ্যমে সেই কবরে আব্বাসীয় খেলাফতের দাফন সম্পন্ন হলো।





বই: সানজাক ই উসমান