⊕ যে ইতিহাস চোখের পানিতে লেখা। - মাওলানা মারজান আহমেদ চৌধুরী।
৪র্থ হিজরির শুরুর দিকের কথা। সাহাবিরা তখনও উহুদ যুদ্ধের ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি। এমতাবস্থায় জানা গেল, হুযায়ল গোত্রের নেতা খালিদ ইবন সুফইয়ান মদীনায় আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করছে। সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উনাইসকে প্রেরণ করলেন। আবদুল্লাহ ইবন উনাইস রা. একাকী এক সুকৌশলী অভিযানের মাধ্যমে খালিদ ইবন সুফইয়ানকে হত্যা করে সেই ষড়যন্ত্রকে ধুলিস্যাত করে দিয়েছিলেন। মদীনায় ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে নিজের লাঠি মোবারক দান করেছিলেন এবং বলেছিলেন, “এই লাঠির দ্বারা কিয়ামতের দিন আমি তোমাকে পরিচয় করব।” আবদুল্লাহ ইবন উনাইস রা. জীবনভর সেই লাঠি হাতছাড়া করেননি। অসিয়ত অনুযায়ী, তাঁকে দাফন করার সময় লাঠিও তাঁর সাথে কবরে রেখে দেয়া হয়েছিল।
ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হওয়ার কারণে হুযায়ল গোত্র সাহাবিদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার পণ করল। তারা পার্শ্ববর্তী আদ্বাল ও কাররাহ নামক দুটি গোত্রের কিছু লোককে মদীনায় পাঠাল। ওরা মদীনায় গিয়ে ইসলাম কবুল করার ভান করল এবং কয়েকজন সাহাবিকে আনতে চাইল, যারা তাদেরকে কুরআন শেখাবেন। তাদের আগ্রহ দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ আসিম ইবন সাবিত রা. এর নেতৃত্বে ১০ জন সাহাবিকে তাদের সাথে প্রেরণ করলেন। সাহাবিরা আর-রাজী নামক কূপের পাশে পৌঁছতেই দেখতে পেলেন, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কয়েকশ মানুষ তাঁদেরকে ঘেরাও করেছে। বুঝতে বাকি রইল না যে এটি তাদের পাতানো ফাঁদ। সাহাবিরা পাশের একটি টিলায় আশ্রয় নিলেন এবং হাতে যা কিছু ছিল, তাই নিয়ে কাফিরদের মোকাবিলা শুরু করলেন।
ওই এলাকায় এক মহিলা ছিল, যার স্বামীকে সাহাবিদের দলনেতা আসিম রা. উহুদ যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন। ওই মহিলা শপথ করেছিল, সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করবে। সে ঘোষণা দিয়েছিল, যে আসিমের মাথা এনে দিতে পারবে তাকে একশটি উট পুরস্কার দেয়া হবে। আসিম সেটি জানতেন। যখন বুঝতে পারলেন আর বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না, তখন তিনি হাত উঠালেন, “হে আল্লাহ, আমাদের নবীর কাছে তুমি আমাদের সংবাদ পৌঁছে দিও। হে আল্লাহ, দিনের বেলা আমি তোমার জন্য আমার প্রাণ কুরবান করছি। অতএব রাতের বেলা তুমি আমার দেহকে রক্ষা করো। আমি আমার মাথার খুলিকে ওই মহিলার মদের পেয়ালা বানাতে চাই না।”
যুদ্ধ শেষে রাতের বেলা কাফিররা আসিম রা. এর দেহটি খুঁজতে শুরু করল। কারণ তাঁর মাথার বিনিময়ে একশটি উট পুরস্কার পাওয়া যাবে। যেইমাত্র তারা টিলার ওপর আসিমের দেহটি শনাক্ত করল, ঠিক ওই সময় মরুভূমির বালু ফুঁড়ে আচমকা একটি খরস্রোতা নদী উৎপন্ন হলো এবং সোজা বয়ে চলে টিলার ওপরে উঠে আসিমের দেহকে ভাসিয়ে নিয়ে মরুভূমিতে গায়েব হয়ে গেল। আল্লাহ তাঁর বান্দার আকুতির মান রেখেছিলেন। দেহটি চিরতরে সরিয়ে নিয়েছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। আজকের দিন পর্যন্ত কেউ জানে না, আসিম রা. এর দেহটি কোথায় আছে।
শেষপর্যন্ত খুবাইব রা. ও যায়েদ রা. ছাড়া বাকি সব সাহাবি শাহাদাত বরণ করলেন। কাফিররা খুবাইবকে বন্দী করে একটি গোত্রের কাছে বিক্রি করে দিল, যারা পরবর্তীতে তাঁকে শহীদ করেছিল। একইভাবে তারা যায়েদকে বিক্রি করে দিল কুরাইশদের কাছে। সেখানে যায়েদকে হত্যা করার পূর্বে মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান বলেছিলেন, “আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিচ্ছি, সত্য করে বলো। তোমার কি মনে হচ্ছে না যে, যদি তোমার পরিবর্তে তোমার নবী এখানে বন্দী থাকতেন, আর তুমি তোমার পরিবারের সাথে থাকতে, তাহলে কত ভালো হতো?” যায়েদ রা. জবাব দিলেন, “আল্লাহর কসম, আমার নবী বন্দী হওয়া তো দুরের কথা, তাঁর পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার চাইতেও আমি আমার বন্দিত্বকে অধিক পছন্দ করি।” জবাব শুনে আবু সুফইয়ান বলেছিলেন, “মুহাম্মাদের সাহাবিরা মুহাম্মাদকে যতটা ভালোবাসে, দুনিয়ার কোনো মানুষ অন্য মানুষকে ততটা ভালোবাসে না।”
ওদিকে মদীনায় তখন উপস্থিত হয়েছেন নজ্দ এলাকার নেতা আবুল বারা। নিজে মুসলিম না হলেও তিনি নজ্দ এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য সাহাবিদেরকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ রাজি হলেন না। বললেন, “আমি নজ্দবাসীর হাতে আমার সাহাবিদের ক্ষতির আশঙ্কা করছি।” আবুল বারা আশ্বস্ত করলেন যে, তিনি নিজে সাহাবিদের দায়িত্ব নেবেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আল-মুনযির ইবন আমর রা. এর নেতৃত্বে ৭০ জন সাহাবিকে আবুল বারার সাথে নজ্দে প্রেরণ করলেন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন আহলে সুফফার সদস্য। এরা তাঁদের কুরআনের ইলম, কিরাত, হিফজ, অধিক ইবাদত ও দুনিয়া-বিমুখতার জন্য অন্যদের চেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
ওদিকে আমির ইবন তুফাইল নামে নজ্দের আরেক নেতা ছিল, যে মুসলমানদের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করত। পথিমধ্যে সাহাবিরা হারাম ইবন মিলহান রা. এর মাধ্যমে তার কাছে রাসূল ﷺ এর একটি পত্র প্রেরণ করলেন। আমির ইবন তুফাইল পত্রবাহককে অন্যায়ভাবে হত্যা করল। এরপর সে বাকি সাহাবিদেরকেও হত্যা করার পরিকল্পনা করল। কিন্তু অধিকাংশ নজ্দবাসী তার পরিকল্পনায় সাড়া দিল না। কারণ সবাই জানত, আবুল বারা সাহাবিদের দায়িত্ব নিয়েছেন। আরবে কোনো গোত্রপ্রধান যখন কারও দায়িত্ব নিত, তখন অন্যরা সেটিকে সম্মান করত। আমির ইবন তুফাইল অনেক চেষ্টাচরিত্র করে আসিয়্যাহ, রা'ল এবং যাকওয়ান নামক তিনটি গোত্রকে তার কূটচালে রাজি করাতে সক্ষম হলো। তিনটি গোত্রের পাঁচ শতাধিক সশস্ত্র ব্যক্তি মাউনা কূপের পাশে অবস্থানরত সাহাবিদের ওপর আচমকা আক্রমণ করল। দায়িত্বগ্রহণকারী আবুল বারা অনেক চেষ্টা করেও আক্রমণ রুখতে পারেননি। মৃত্যুকে সামনে রেখে সাহাবিরা দুআ করলেন, “হে আল্লাহ, আমাদের নবীর কাছে আমাদের সংবাদ পৌঁছে দিও। তাঁকে জানিয়ে দিও, আমরা এমন অবস্থায় শহীদ হয়েছি যখন আমরা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট এবং তুমিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।”
আমির ইবন তুফাইলের নেতৃত্বে কাফিররা একে একে ৬৯ জন নিরস্ত্র সাহাবিকে মাউনা কূপের পাশে জবাই করে হত্যা করেছিল। বিশ্বাসঘাতকতার এত বড় উদাহরণ পুরো সীরাতে আর একটিও নেই। একজন সাহাবিকে তারা ছেড়ে দিয়েছিল মদীনায় সংবাদ পৌঁছানোর জন্য। তবে তিনি মদীনায় পৌঁছার আগেই আল্লাহ তাঁর নবী ﷺ এর কাছে সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিলেন।
এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, আর-রাজী ও মাউনা কূপের মর্মান্তিক সংবাদ একই রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে পৌঁছেছিল। বেদনার তীব্রতায় আল্লাহর হাবীব ﷺ কাতর হয়ে পড়েছিলেন। মুহাম্মাদী বাগানের এতগুলো গোলাপ এক মূহুর্তে ঝরে গেল, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এটি কীভাবে মেনে নেবেন! এই সাহাবিরা তাঁর এত বছরের পরিশ্রমের ফসল। এদেরকে তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন। এরা খেয়ে, না খেয়ে তাঁর মসজিদের বারান্দায় পড়ে থাকতেন। তিনি নিজের মুখের লুকমা এদের সাথে ভাগ করে খেতেন। তাঁর একটি ইশারায় এরা প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত ছিল। আজ এদের কেউ অবশিষ্ট নেই। বারান্দা আজ বিরান পড়ে আছে। এ কষ্টের কোনো উদাহরণ, কোনো তুলনা হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ টানা একমাস ৫ ওয়াক্তের প্রত্যেক ফরয নামাজে ওই বিশ্বাসঘাতক কাফিরদের প্রতি কুনুতে নাযিলাহ (قنوت النوازل) পাঠ করেছিলেন।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এই 'জানেসার' বাহিনীর ত্যাগ ও কুরবানির ফলে আজ আমরা ইসলাম পেয়েছি। তাঁরা ক্ষুধার কষ্টে পেটে পাথর বেধেছেন বলে, তাঁরা মরুভূমির উত্তপ্ত গরমে শরীরের হাড় গলিয়েছেন বলে, তাঁরা ঘোড়ায় চড়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়েছেন বলে, তাঁরা তাঁদের কলিজার রক্তে কাফিরের তরবারি রাঙিয়েছেন বলে আজ আমরা মুসলমান হওয়ার বড়াই করতে পারছি। তাঁদের রূহের প্রতি আমাদের অযুত-নিযুত সালাম।
اللهم صل على محمد وعلى آل محمد وعلى اصحاب محمد
সূত্রঃ সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনান আবি দাউদ, মুসনাদে আহমদ, ফাতহুল বারী, সীরাতে ইবনে হিশাম, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ।

0 মন্তব্যসমূহ