শিক্ষা বিবর্জিত সেলজুকিরা তাদের রাজদরবারে দেশের সশ্রদ্ধেয় আলেম, পণ্ডিত ও সুশীল বুদ্ধিজীবীদের পৃষ্ঠপােষকতা দিলাে। তাদের সেই
পূর্বের সমাজ-সভ্যতার আলাে বিবর্জিত মানসিকতা ভব্যতা ও স্বজন ভালােবাসার উষ্ণ
রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠলাে। এতাে সবাই জানে ইসলাম ও একত্ববাদের সুউচ্চ প্রাসাদটির মহারক্ষক ও পরম সাহায্যকারী স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। যিনি আরবের ভুখা-নাঙ্গা মরুচারী এবং পাপ ও মূর্খতার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া বান্দাদের রেসালত ও তার মনােনীত ধর্ম ইসলামের
রৌশনীতে উদ্ভাসিত করেছেন। তেমনি পশ্চাদপদ এই তুর্কীদেরও তিনি ধুলােয় থেকে
উঠিয়েছেন মর্যাদার কুলােয়। সৈন্য ও সমরশক্তি এবং নেতৃত্ব দানের অপার বিচক্ষণতা
ও ধীমান শক্তিমত্তা তিনি তাদের দান করেন। দেখতে দেখতে তারা ইরাক, ইরান,
সিরিয়া, আরব উপদ্বীপে তাদের শাসনরাজ্য প্রতিষ্ঠাসহ এশিয়ার এক অংশকে তাদের
করদরাজ্যে প্রতিষ্ঠা করে। তাদের চলার পথে যখনই ইসলাম ও মুসলমানের শক্রদল
বাধা হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছে তাদেরকে পায়ে পিষে অপ্রতিরােধ্য চলার গতিকে তারা আরাে বেগবান করেছে। খেলাফতে আব্বাসিয়ার প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ফাঁকফোকরের কারণে যে অরাজক
অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলাে তার মূলােৎপাটন তারা নিশ্চিত করে। এভাবে তারা আফগানিস্তান থেকে রােম সাগর পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এর পুরোটাই ইসলামী সাম্রাজ্য।
রাজতন্ত্র ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় অনুমােদিত নয়। কিন্তু সেলজুকিরা তাদের
সালতানাতে ইসলামিয়াকে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনার জন্য রাজ-শাসন
ব্যবস্থার গােড়াপত্তন করে। এর ফলে রাজ্যজুড়ে যে বিশৃংখলা ও অনৈক্যের কালাে মেঘ
পুলিলু ছিলাে তা ঐক্যের মিষ্টি হাওয়ায় নিমিষেই কেটে যায়।


এরপরই সেলজুকিরা ইউরােপীয় ক্রুসেডারদের মুহুর্মুহু আক্রমণকে এমন কঠোর হস্তে
নস্যাৎ করে দেয় যে, তাদের কোমর অনেকদিনের জন্য বাত-ব্যামােতে আক্রান্ত থাকে।
সেলজুক ইবনে একায়েকের শাসনকাল পৌছে তুঘরল বেগ সেলজুকি ও চোরা
বেগ সেলজুকি পর্যন্ত। যে কোন রাজপরিবারে একটা অনিবার্য প্রথা আছে। তা হলাে
সিংহাসন দখল নিয়ে এক ভাই আরেক ভাইয়ের রক্ত পান করতেও দ্বিধা করে না। আর
কোন সহােদর বােন থাকলে মহল ষড়যন্ত্রে সে আলাদা মাত্রা যােগ করে। এমন কোন
রাজপরিবার অতিবাহিত হয়নি যেখানে মহল ষড়যন্ত্র ছিলাে না। কিন্তু সেলজুক পরিবার
পরস্পরের প্রতি শত্রুতা পােষণকে পাপ মনে করতাে। পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতাকে
নিজেদের দুর্বলতা মনে করতাে তারা।
তুষরুল বেগ ও চেরা বেগ সহােদর ছিলেন। তাদের পরস্পরের সম্পর্ক ছিলাে
দারুণ প্রীতিপূর্ণ। উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনের অগ্রাধিকার বড় ভাই হলেও ছােট
ভাইকে বড় ভাই প্রশাসনে সমান অংশীদারে রাখলেন। এজন্য তিনি রাজ্যের রাজধানী
বানালেন দুটি। চেগরা বেগের জন্য রাজধানী বানালেন তুর্কীর মারুকে এবং নিজের জন্য  খােরাসানের শহর নিশাপুরকে রাজধানী নির্ধারণ করলেন।


লেখক-এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ